লেখকঃ মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন
কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক, ছাত্র অধিকার পরিষদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 
.

জেল থেকে বের হওয়ার দিন আত্মীয়-স্বজন সবাই আমাকে দেখতে আসে, বউয়ের সাথে একান্ত আলাপ করার সময় হয় না। রাতে প্রকৃতি যখন চুপ হয়ে যায়, সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, বউ তখন আমাকে ধরে হাউমাউ করে কাঁদে আর বলে, এই দুই মাস আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। তোমার গায়ের গন্ধ নিয়ে আমি ঘুমানোর চেষ্টা করতাম, তোমার ঐ শার্টটা বালিশের নীচে রেখে ঘুমাতাম, যাতে মনে হয় তুমি আমার কাছেই আছো। তারপরেও ঘুম আসতো না। রাতের অন্ধকারে আমার মধ্যে ভয় সৃষ্টি হতো আর আমি শুনতে পেতাম," আমাকে বাঁচান, ডিবি পুলিশ আমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে!" এই কথা মনে হওয়ার পরে আমি চিৎকার করে উঠতাম। মা-আব্বা দু'জনই আমার চিৎকার শুনে রুমে চলে আসতো। এরপর সূরা পরে মাথায় ফু দিয়ে দিতো। মা আমাকে ঘুম পাড়াতে মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো, তখন একটু ঘুম আসতো। তুমি আমাকে রেখে আর কোথাও যাবে না তো? আমার চোখগুলো দেখো, চোখের চারপাশে কালো দাগ, চোখগুলো ফুলে গেছে। আমি তোমাকে হারালে বাঁচতে পারবো না। 
তোমাকে কতোটা ভালবাসি তুমি জেলে যাওয়ার পরে আরও বেশি করে বুঝেছি। প্লিজ, তুমি আর কোন আন্দোলনে যাবে না। মা তোমার জন্য পাগলের মত ছুটেছে.....!

আমার মুক্তির দাবিতে আমার বউ ও আমার মা-বাবা, বোনরা যেখানে যেতো অধিকাংশ সময় বাসে যাতায়াত করতো। তাদের কাছে তেমন টাকা থাকতো না। কেউ টাকা দিতে চাইলেও নিতো না। এতোকিছুর মধ্যেও আমার বউ ৩-৪ টা টিউশন করাতো। কারণ টিউশন না করলেও চলা সম্ভবপর ছিলো না। আমার বউ টিউশনি করিয়ে তার ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ দিতো, তার নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতো। এতো ঝামেলার মধ্যেও টিউশনি ছাড়েনি। 

আমি যখন স্বাভাবিক জীবনে ছিলাম, জবের পড়াশোনার জন্য টিউশন ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন আমার খরচও দিতো আমার বউ। ওর টিউশনির টাকা দিয়ে আর বাড়ি থেকে হাজার দু'য়েক নিয়ে চলতাম। বউয়ের টিউশনির টাকা নিয়ে চলার মধ্যে একটা দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা হলো দ্রুত জব খুঁজে পাওয়া। আর আপনি যখন স্টুডেন্ট লাইফে আপনার বউয়ের উপার্জিত টাকা দিয়ে চলবেন, আপনার জব পাওয়ার পরে বউয়ের প্রতি আলাদা ভালবাসা কাজ করবে। চাকরিজীবনের লাখ টাকা বেতনের চেয়েও বউয়ের দেওয়া দুই হাজার টাকার মূল্য অনেক বেশি।আমার জীবনের সাথে যাদের মিল আছে, তারা এই বিষয়টি বুঝতে পারবে।

যাইহোক, ঐদিন আমিও বউকে ধরে অনেক কাঁদি। দু'জনের কান্না একসময় সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। পিছনের সব দুঃখ যেন এই কান্নার মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে।
জেল থেকে বের হওয়ার পরে অন্তত ৬ মাস বউ আমাকে একা কোথাও যেতে দেয়নি। যেখানেই গেছি বউ সাথে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ জীবন নিয়ে যারা চলাফেরা করে তাদের যেমন বডিগার্ড থাকে। আমার বডিগার্ড হয়ে যায় আমার বউ। 
এমনও দিন গেছে বউকে বাইরে বসিয়ে রেখে আমি ৩-৪ ঘন্টার কনফারেন্স প্রোগ্রামে,,বউ ধৈর্য্য ধরে একাই বসে থাকতো।

Believe it or not, এখনো আমার বউয়ের কোন স্মার্টফোন নেই। বিভিন্ন সময়,আমি ওকে ফোন কিনে দিতে চেয়েছি। ও বরাবরই আমাকে বলেছে,,বাসাভাড়া দিতে পারো না, আবার ফোন? ও সমাজের আট দশটা মেয়ের মত না। স্বামীর কাছ থেকে খুব বেশি বিলাসিতা পছন্দ করে না। নিজের জিনিস নিজের টিউশনির টাকা দিয়েই কিনতো। কেনাকাটা খুব সামান্য। ঈদে ছাড়া সচারাচর কখনোই কিছু কেনে না। 

ওর কোন ফোন না থাকাতে বেশ ভালোই হয়েছে। রাতে বাড়িতে ফিরে আমি যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফেসবুক চালাই, তখন পাশে থাকে বউ। দু'জনের একই টাইমলাইন। আমি স্ক্রলিং করে নিউজফিডে যত নীচে আসি, ও চেয়ে থাকে, আমি কোন লেখা পড়লে, ওউ পরে। মাঝেমধ্যে আমি বিরক্ত হয়ে বলি, আমি যা দেখি সব তোমার দেখতে হয়?
ও তখন বলে, ঐ আমি কি দেখছি? তুমি যা দেখছো,,আমিও তাই দেখছি। আমি বলি, তোমার দেখতে হবেনা, যাও। তখন ও ফোনটা কেড়ে নেয়। আমি তখন ফোনটা নিয়ে বলি, ঠিক আছে,দেখো। এভাবে দেখতে দেখতে ও ঘুমিয়ে যায়। আমি জেগে থাকি। আর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেই হাসি!

যারা ছাত্র জীবনে আমার মত বিয়ে করেছেন, তারা শুধু আমার লেখাগুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবেন। ছাত্রজীবনে বিয়ে ও বউ দুইটাই অনেক দুর্লভ বস্তু। এই বস্তু আপনাকে সুখ দিবে, মানসিক পরিতৃপ্তি দিবে। এই বস্তু আপনাকে ভাল রাখবে, আপনি ভাল থাকবেন।  

যারা দেরিতে বিয়ের কথা বলে, প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিয়ের কথা বলে, আমি তাদের মতামতের ঘোর বিরোধী। আমার দৃষ্টিতে বিয়ের বয়স হলেই বিয়ে করা উচিত। বিয়ে করে কেউ কখনো ঠকেছি। কিন্তু সময়মত বিয়ে করতে না পারায় অনেকের প্রেয়সী অন্যকারও হয়ে গেছে। কষ্ট পেয়েছে দুটি জীবন। এই কষ্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভোগায়।
.
👉নিজে বিয়ে করুন। বন্ধুদেরকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করুন।