মিসওয়াকের গুরুত্ব ও ফযীলত 

মিসওয়াক(اَهمِيكونَةُ السِّوَاكِ) এর পরিচয়ঃ

মিসওয়াক সিওয়াক ধাতু থেকে নির্গত। এর অর্থ মাজা, ঘষা। পরিভাষায় মিসওয়াক বলা হয় গাছের ডাল বা শিকড় যা দিয়ে দাঁত মাজা ও পরিষ্কার করা হয়। আর দাঁত মাজাকেও মিসওয়াক করা বলা হয়। মিসওয়াক করে দাঁত পরিষ্কার করা আল্লাহ্ তায়ালার নিকট অত্যন্ত প্রিয়।

মিসওয়াকের গুরুত্ব :

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম এর প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন এবং এর প্রতি তাকীদও করেছেন। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ 
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مَنْصُورٍ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ ‏ "‏ لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لأَمَرْتُهُمْ بِتَأْخِيرِ الْعِشَاءِ وَبِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلاَةٍ ‏"‏ ‏.‏

আবূ হুরায়রা (রাঃ থেকে বর্ণিতঃ:

রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যদি আমার উম্মতের পক্ষে কষ্টকর হবে বলে মনে না করতাম, তাহলে আমি ইশার সালাত বিলম্বে আদায় করার এবং প্রত্যেক সালাতের (উযূর) সময় মিসওয়াক করার জন্য আদেশ করতাম।
আন-নাসায়ী ৫৩৪

حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، مُحَمَّدُ بْنُ الْعَلاَءِ حَدَّثَنَا ابْنُ بِشْرٍ، عَنْ مِسْعَرٍ، عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ شُرَيْحٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ قُلْتُ بِأَىِّ شَىْءٍ كَانَ يَبْدَأُ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا دَخَلَ بَيْتَهُ قَالَتْ بِالسِّوَاكِ ‏.‏

মিকদাম-এর পিতা শুরায়হ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ঘরে ঢুকে সর্বপ্রথম কোন্‌ কাজটি করতেন? তিনি বললেন, সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। (ই.ফা. ৪৮১, ই.সে. ৪৯৭)
মুসলিম ৪৭৮

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ‏.‏‏
হুযায়ফাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন রাতে (সালাতের জন্য) উঠতেন তখন মিসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন।

(৮৮৯, ১১৩৬; মুসলিম ২/১৫, হাঃ ২৫৫, আহমাদ ২৩৪৭৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪৪)
বুখারী ২৪৫

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، عَنْ حُصَيْنٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا قَامَ لِيَتَهَجَّدَ يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ ‏.‏

হুযাইফাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্‌(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তাহাজ্জুদের জন্যে উঠতেন তখন মিসওয়াক দ্বারা ঘষে মুখ পরিষ্কার করতেন। (ই.ফা.৪৮৪, ই.সে. ৫০০)
মুসলিম ৪৮১

أَخْبَرَنَا حُمَيْدُ بْنُ مَسْعَدَةَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى، عَنْ يَزِيدَ، - وَهُوَ ابْنُ زُرَيْعٍ - قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي عَتِيقٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبِي قَالَ، سَمِعْتُ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ ‏ "‏ السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ ‏"‏ ‏.‏

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেনঃ তিনি বলেছেন যে, মিসওয়াক মুখের পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ ও আল্লাহ্‌র সন্তোষ লাভের উপায়।
সুনানে আন-নাসায়ী ৫

অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে –

حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ شُعَيْبٍ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي الْعَاتِكَةِ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ يَزِيدَ، عَنِ الْقَاسِمِ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ ﷺ ـ قَالَ ‏ "‏ تَسَوَّكُوا فَإِنَّ السِّوَاكَ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ وَمَا جَاءَنِي جِبْرِيلُ إِلاَّ أَوْصَانِي بِالسِّوَاكِ حَتَّى لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ يُفْرَضَ عَلَىَّ وَعَلَى أُمَّتِي وَلَوْلاَ أَنِّي أَخَافُ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَفَرَضْتُهُ لَهُمْ وَإِنِّي لأَسْتَاكُ حَتَّى لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ أُحْفِيَ مَقَادِمَ فَمِي ‏"‏ ‏.‏

আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা মিসওয়াক করো। কেননা মিসওয়াক মুখ পবিত্র ও পরিষ্কার করে এবং মহান প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের উপায়। আমার কাছে যখনই জিবরীল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এসেছেন তখনই আমাকে মিসওয়াক করার উপদেশ দিয়েছেন। শেষে আমার আশঙ্কা হয় যে, তা আমার ও আমার উম্মাতের জন্য ফরয করা হবে। আমি যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা না করতাম, তাহলে তাদের জন্য তা ফরয করে দিতাম। আমি এত বেশি মিসওয়াক করি যে, আমার মাড়িতে ঘা হওয়ার আশঙ্কা হয়।
আহমাদ ২১৭৬৬, ইবনে মাজাহ ২৮৯

মিসওয়াকের ফযীলত :

মিসওয়াকের বহু ফযীলত হাদীসে বর্ণিত আছে।
এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে –
হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে নামাযের জন্য মিসওয়াক করা হয় তার ফযীলত ঐ নামাযের তুলনায় সত্তর গুণ বেশী, যে নামাযের জন্য মেসওয়াক করা হয় না।
(শুআবুল ঈমান)

মিসওয়াক করার উপকার :

• মিসওয়াক করলে আল্লাহ্ তায়ালার রেযামন্দী হাসিল হয়।
• মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়, দাঁত মজবুত হয়।
• মাথার ব্যথা উপশম হয়, কাশি দূর হয়, পাকস্থলী ঠিক থাকে এবং শরীর শক্তিশালী হয়।
• দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়, স্মরণশক্তি ও জ্ঞান বাড়ে।
• অন্তর পবিত্র হয়, সৌন্দর্য বাড়ে।
• ফিরিশতা তার সাথে মুসাফাহা করেন, নামাযের জন্য বের হলে তাকে সম্মান করেন, নামায আদায় করে বের হলে আরশ বহনকারী ফিরিশতা তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
• শয়তান অসন্তুষ্ট হয়, বিজলীর ন্যায় পুলসিরাত পার হবে, আমলনামা ডান হাতে পাবে।
• ইবাদতে শক্তি পাবে, মৃত্যুর সময় কালিমা নসীব হবে, তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হবে এবং পূত-পবিত্র হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে।
(মারাকিল ফালাহ, পৃ. ৫৪)

মিসওয়াকের ধরণ :

• যে সব গাছের স্বাদ তিতা সে সব গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব।
• যায়তূনের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করা উত্তম।
• মিসওয়াক কনিষ্ঠ আঙ্গুলের মত মোটা হওয়া উত্তম।
• মিসওয়াক প্রথমে এক বিঘত পরিমাণ লম্বা হওয়া উত্তম।
• মিসওয়াক নরম ও কাঁচা হওয়া উত্তম।
• মিসওয়াক কম গিরা সম্পন্ন হওয়া উচিত।
• অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে অজুতে কুলি করার পূর্বে মিসওয়াক করা উত্তম। তবে কোন কোন আলিম উযূ করার পূর্বে মিসওয়াকের কথাও বলেছেন।
• ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর, নামাযের আগে, মজলিসে যাওয়ার পূর্বে এবং কুরআন ও হাদীস তিলাওয়াত করার পূর্বে মিসওয়াক করা মুস্তাহাব।

মিসওয়াক ধরার তরীকা :

• মিসওয়াক ডান হাতে ধরা মোস্তাহাব।
• ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল মিসওয়াকের নীচে আর মধ্যমা ও তর্জনী মিসওয়াকের উপরে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলী দ্বারা এর মাথার নিচ ভালভাবে ধরা। এভাবে মিসওয়াক করা হযরত ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত রয়েছে।

মিসওয়াক করার তরীকা :

• মিসওয়াক শুরু করার পূর্বে ভিজিয়ে নেয়া উত্তম।
• প্রথমে উপরের দাঁতের ডান দিক অতঃপর বাম দিক, তারপর নীচের দাঁতের ডান দিকে অতঃপর বাম দিকে, তারপর দাঁতের ভিতরের দিকে অনুরূপভাবে ঘষতে হবে।
• উপরোক্ত নিয়মে তিনবার ঘষা উত্তম। প্রতিবারেই নতুন পানি দিয়ে মেসওয়াক ধুয়ে দেয়া মোস্তাহাব।
• মিসওয়াক দাঁতের অগ্রভাগে, উপর ও নীচের তালুর অগ্রভাগে এবং জিহবার উপরিভঅগেও করা উত্তম।
• মিসওয়াক দাঁতের উপর চওড়াভঅবে ঘষা নিয়ম। ইমাম গাযযালী (রহ.) উপর নীচ-ভাবে ঘষার কথাও বলেছেন। কমপক্ষে চওড়াভাবে ঘষতে হবে।
• শোয়া অবস্থায় মিসওয়াক করা মাকরূহ।
• মিসওয়াক করার পর মেসওয়াক ধুয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।

বি. দ্র. :- মিসওয়াক না থাকলে মিসওয়াকের বিকল্প হিসেবে ব্রাশ ব্যবহার করা যায়। এতে মিসওয়াকের ডাল বিষয়ক সুন্নাত আদায় না হলেও মাজা ও পরিস্কার করার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় হাত দিয়ে বা মোটা কাপড় দিয়ে দাঁত মেজে নিতে হবে। হাত দিয়ে মাজার তরীকা হল: ডান হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল দিয়ে ডান পাশের দাঁতের উপরে অতঃপর নীচে, তারপর শাহাদাত (তর্জনী) আঙ্গুল দিয়ে ঘষতে হবে।