#রিলেশন_সিরিস
#আড়ালে_ভালোবাসার_সংসার
#শেষপর্ব 
#Ipshita_Shikdar (samia)



দিশা ও নীলাভ্রের বিয়ের এক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। এই এক সপ্তাহে বিধান বিথী একে অপরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও দুই বছর একে অপরের সাথে কথা না বলায় কেমন একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছে দুজনের মাঝে। তাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে কেউই কথা বলতে পারেনি। বিধানের বিজনেস সেমিনারে দুইদিনের জন্য বান্দরবন যেতে হবে এবং বিথীকেও সাথে যেতে হবে। কারণ সকল বিজনেস পার্টনারদের তাদের ওয়াইফসহ আসতে হবে। 

রাতে ডিনার টেবিলে মিসেস চৌধুরী বিথীকে জিজ্ঞেস করেন, কিরে মামুনি তোরা কখন যাবি?
বিথী নিচু কণ্ঠে বলে, আগামীকাল ভোরে মামুনি। 
বিধান তখন মিসেস চৌধুরীকে বলে, আম্মু তুমি পারবে তো এই দুই বিচ্ছুকে সামলাতে নিজের কাছে রাখতে চাইছো যে। 
মিসেস চৌধুরী মুচকি হেসে বলে, তোকে সামলিয়েছি আর ওদের পারবো না.......তাছাড়া রূপও আছে।
বিধান মিসেস চৌধুরীকে উত্তরে মুচকি হেসে সম্মতি জানায়। 

সকালে বিধানের ঘুম ভাঙে এর্লামের আওয়াজে কিন্তু এই এর্লাম তো সে লাগায়নি। পরক্ষণেই মনে পড়ে যায় এটা তার বউয়ের কাজ। কারণ গত দুবছর ধরে বিথী বিধানের ঘুম এভাবেই ভাঙিয়ে আসছে যাতে তার বিধানের মুখাপেক্ষী হতে বা বিধানের সাথে কথা বলতে না হয়। বিধান আর বেশি কিছু না ভেবে শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে এলো ওয়াসরুম থেকে। ওয়াসরুম থেকে বের হতেই চোখ জোড়া আটকে গেলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নেভি ব্লু রংয়ের শাড়ি পরিহিতা নারীর দিকে কিন্তু নারীটির তার দিকে চোখ পড়তেই সে চোখ ফিরিয়ে নিলো। সেই নারীটি আর কেউ নয় তারই স্ত্রী বিথী কিন্তু কিছু দ্বিধায় তাকেই উপেক্ষা করে নিচে চলে গেলো বিধান। বিথীও এই কাজে বেশি অবাক হলো না কারণ এই দুবছর বিথী ও বিধান যতটা সম্ভব একে অপরকে এড়িয়ে চলার বা উপেক্ষিতা করে থাকার চেষ্টা করেছে। বিথী তার অপরাধবোধে তবে বিধান কেনো করেছে তা সে জানে না। 

বিকেলে বিথী বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বান্দরবনের দূষণমুক্ত শীতল বাতাস উপভোগ করছে এবং বাইরের দৃশ্য দেখায় মনোনিবেশ করছে। এদিকে বিধান বিথীকে রেজর্টের রুমে রেখে বিজনেসের কাজে কোথাও গিয়েছিলো। সে রুমে এসে বিথীকে রুমে খুঁজে না পেয়ে বারান্দায় যেতেই পা জোড়া থমকে গেলো কারণ বিথী এক হাতে বারান্দার দেয়ালে ভর দিয়ে অন্য হাতে কফি ধরেছে এবং বিথীর অবাদ্ধ চুল ও শাড়ির আচল দমকা হাওয়ায় উড়ছে। বিধানের কাছে এ দৃশ্যই পৃথিবীর সেরা দৃশ্য যা দেখে সে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিথীর দিকে দ্বিধাদ্বন্দ্বগুলোকে উপেক্ষা করে। কারণ সেও তো চায় এক স্বাভাবিক সংসার। 

অন্যদিকে বিথী প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে নিজের ছন্নছাড়া ও দিশাহারা জীবনটা নিয়ে ভাবছিলো। ঠিক তখনই নিজের কোমরে কারো ছোঁয়া অনুভব করে যা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছিলো। বিথীর চেনা এই ছোঁয়াটাকে বিথী দুই বছর ধরে যার অভাব প্রতিটি নিশ্বাসে অনুভব করতো। তাই আজ সেই ছোঁয়া পেয়ে গভীর আবেগে বিধানের হাত খামছে ধরে। বিধান বিথীকে পিছন থেকে আরও গভীরভাবে আকরে ধরে বিথীর পিঠে ঠোঁট ছোঁয়ায়। বিথী নিজের ঘাড়ে বিধানের অশ্রুর স্পর্শ পেয়েই পিছন ঘুরে বিধানকে ঝাপটে ধরে হুহু করে কেঁদে দেয়। বিধানও কাঁদছে তবে নিশ্চুপ ভাবে কারণ অদ্ভুত এই দুনিয়াতে যে ছেলেদের কাঁদতে মানা। আজ এই গৌধুলি লগ্নে দুজন ভালোবাসার মানুষ পুনরায় মিলিত হচ্ছে এবং তাদের মধ্যকার দূরত্বটা অশ্রুজল হয়ে বয়ে যাচ্ছে।

বিধান হঠাৎ বিথীকে ছেড়ে বিথীর মুখটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে তার কপালে নিজের ঠোঁটজোড়া দ্বারা উষ্ম চিহ্ন একে দিয়ে বলে, ভালোবাসি......বড্ড ভালোবাসি! 
বিথীও পরম আবেশে বলে উঠে, আমিও ভালোবাসি.....শুধু তোমায়ই ভালোবাসি!
বিধান হালকা অভিমানের সুরে বলে, মোটেও না........ভালোবাসলে কাছে আসোনি কেনো! ধরা দেওনি কেনো!
বিথীও বিধানের কথা শুনে অভিমানের সুরে বলে, তাহলে তুমি কাছে আসোনি কেনো.......আমি নাহয় নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করতে পারি না তাই বলে তুমিও!
বিধান মুচকি হেসে বলে, পাগল আমি যে নিজের অপরাধবোধে ধুকে ধুকে মরছিলাম........আমারই সামনে আমারই বোন বিনাদোষে কষ্ট পাচ্ছিলো সেখানে আমি কি করে ভালোবাসার মানুষের সাথে সুখের সংসার করতে পারতাম! জানো এখনো কষ্ট হয় যদি তোমাকে বলে দিতাম দিশা আমার বোন তাহলে হয়তো.......
বিধানকে বলতে না দিয়ে বিথী বলে উঠে, দোষটা তোমার নয় আমারও.........আমি বিনা সত্য জেনেই তোমাদের বিচার করতে যেয়ে অজান্তেই অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছি! তোমার বারবার আমার বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞেস করার পরও চুপ থেকে আমি সন্দেহকে পানাহ দিয়েছি মনে....... এই অপরাধবোধে পারিনি ক্ষমা চাওয়ার জন্য দিশার সামনে যেতে.......তোমার সামনে যেতে!
বিথী এসব বলেই বিধানের হাত জোড়া ধরে হুহু করে কেঁদে দেয় তাই বিধান বিথীকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে চোখের পানি মুছে বলে, দোষ আমারও ছিলো! তোমাকে বলা উচিত ছিলো আমার কারণ যেখানে আমি তোমাকে অন্যের সাথে সহ্য করতে পারিনা তুমি কি করে পারতে..........আমি ভেবেছিলাম তুমি দিশা ও আমার সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক নিবে কারণ ইরহা আমার অনেক ক্লোজ হলেও তুমি কখনো কোনো রিয়েক্ট করতে না তাই......
বিথী হঠাৎ করেই বলে উঠে, কারণ তখন আমি ভালোবাসতে পারিনি! 
বিধান মুচকি হেসে বলে, হ্যাঁ জানি গো তবে জানতে একটু সময় লেগে গিয়েছে! 
বিধান কিছুটা থেমে হাটু গেড়ে বসে বিথীর দিকে হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, এখন তো ভালোবাসে?
বিথীও কিছু না ভেবে হাত এগিয়ে দিয়ে বলে, অবশ্যই!
বিধান উঠে দাঁড়িয়ে বিথীকে কোলে তুলে বলে, তাহলে চলেন ম্যাডাম আজ নতুন করে ডুব দিব এক অপরের মাঝে........একে অপরকে ভালোবেসে!
বিথী কিছু না বলে নিজের লজ্জারাঙা মুখটা বিধানের বুকের মাঝে লুকিয়ে নেয় যেনো এটাই তার জন্য সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয়।

অপরদিকে দিশা ও নীলাভ্র কাউকে না জানিয়ে আজ পাড়ি জমাতে যাচ্ছে নিউইয়র্কে। কারণ দিশা ও নীলাভ্র সকল পুরোনো স্মৃতি মুছে ফেলে নতুন জীবনের আরম্ভ করতে চায় তাই চলে যাচ্ছে সকল স্মৃতির পটভূমি বাংলাদেশকে ছেড়ে। এর পিছনে রয়েছে দিশার বলা একটা কথা, সব সংসার তো ভালোবাসার হয় আমাদেরটা নাহয় বন্ধুত্বের হোক.........আল্লাহ চাইলে এক সময় ভালোবাসার বীজ রোপণও হতে পারে দুজনের মনে দুজনের জন্য। হোক না একটা নতুন শুরু সকলকে ছেড়ে ক্ষতি কি আবার সুখের নতুন স্বপ্ন দেখতে......নতুন প্রচেষ্টা করতে।

এভাবেই ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল ভালোবাসাগুলো। ভেঙে পড়া মনগুলো আবারও খুঁজে পাক তাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণাকে।  

সমাপ্ত......