বইঃ গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা
লেখকঃ ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী
প্রকাশনীঃ রাহনুমা প্রকাশনী
মূল্যঃ ৩০০৳
ইস্যু ফিঃ ১০৳
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂

: প্রতিজ্ঞাঃ(বই থেকে কিছু অংশ)

কাফেলা কাছাকাছি চলে এসেছে। সারা মক্কা জেগে উঠলো কাফেলাকে স্বাগত জানাতে। অনেক চিন্তার ভিড়ে শাম থেকে আসা নতুন পণ্য এবং আগামী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে খাদিজা ভাবনা শুরু করে দিলেন। এর মাঝেই ঘোষক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রচার করলো মক্কায়। আশা করা হচ্ছে, রাত পোহালেই শামের কাফেলা মক্কায় পৌঁছে যাবে!
সবাই গুদামঘর ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। পণ্যশালায় ভিড় বাড়তে লাগলো। শুরু হলো আলোচনাঃ লাভ-ক্ষতির। ইয়েমেনী পণ্যে কী পরিমাণ লাভ হতে পারে কিংবা ক্ষতি, সে হিসাবও মুখে মুখে ঘুরতে লাগলো। শাম (সিরিয়া) থেকে বয়ে আনা পণ্যের চাহিদা ও বাজারমূল্য ঠিক আছে তো?
* * *
পরদিন ভোরে মক্কার দৃশ্য বদলে গেলো। সবাই ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে উঠলো। কাফেলাকে স্বাগত জানাতে মক্কার উপকণ্ঠে এসে বসে রইলো। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। এ অপেক্ষায় যোগ হলো কতো মানুষ! যোগ দিলো অসহায় দরিদ্ররাও, যারা বাণিজ্য-কাফেলা ফিরে এলে কিছু না-কিছু পেয়েই যায়। কোলাহল শুরু হয়ে গেলো কুলি ও বোঝা বহনকারীদের মাঝেও, এদেরও এখন কিছু পাওয়ার সময়। অপরদিকে উৎকণ্ঠাভরে অপেক্ষা করছেন একদল মা, যাদের সন্তানেরা গিয়েছিলো এ কাফেলায়, শ্রম দিতে, মজুরির বিনিময়ে! সবাই ফিরে এসেছো তো?! কোনো বিপদ হয় নি তো?! এসব নীরব জিজ্ঞাসাই ভেসে বেড়াচ্ছিলো তাদের চোখে-মুখে.....।

এ দলে দাঁড়িয়ে আছে আরেকদল উদ্বেগাক্রান্ত স্ত্রীও, যারা এখনো জানে না, তাদের স্বামীরা কি সবাই ফিরে এসেছে? নাকি কুদরতের অমোঘ বিধানে কেউ কেউ হারিয়ে গেছে, চলে গেছে না-ফেরার দেশে!
.
সবার মতো খাদিজাও নিজের পণ্যসম্ভার গ্রহণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আগের মতোই তার আঙিনায় অনেক প্রার্থী। দীন-দুঃখী অসহায়দের ভিড়। খাদিজার বাঁদিরাও প্রাণবন্ত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিলো। পরস্পরে বলাবলি করতে লাগলো মালিকান প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কথা। ওদের চোখ হাসছিলো। ওদের মুখ হাসছিলো। ওদের আশাঃ কাফেলা অনেক লাভবান হয়ে ফিরে আসছে। কাফেলা যতো লাভবান ওদের পুরষ্কার ততো ফলবান।
জোহরের পর, আসরের একটু আগে। খাদিজা ভবনের দোতলায় দাঁড়িয়ে আছেন। অপেক্ষা করছেন অধীরচিত্তে। পথের দিকে তাকিয়ে আছেন অনিমেষ (অপলক) চোখে। তাঁকে বেষ্টন করে থাকা বাঁদিরা তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, মালিকানকে সুসংবাদ জানাতে মরিয়া হয়ে। অবশেষে কাফেলা দেখা গেলো, দূর-দিগন্তে। এগিয়ে আসছে মক্কার দিকে। খাদিজা অনুভব করলেন যতো না আনন্দ তারচেয়ে বেশি হৃদয়ের ক্রমবর্ধমান ধুকধুকানি। তিনি যতোটা সম্ভব দৃষ্টি মেলে তাকালেন। হ্যাঁ, এই তো উট গুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে আসছে! কাফেলা ধীরে ধীরে অবয়ব ফিরে পাচ্ছে! হঠাৎ এক বাঁদি সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলোঃ
-মালিকান! মুহাম্মদ, ওই-যে আল-আমীন! পাশে মায়সারা!!
মুহাম্মদ ছিলেন তাঁর উটে, পাশেই মায়সারা আরেকটি উটে। পেছনেই পণ্যবাহী উটের সারি। তখন ঠিক তখনই খাদিজা দেখলেন এক বিস্ময়কর দৃশ্য! খাদিজা লক্ষ করলেন, কাফেলার সবাই পুড়ছে রৌদ্রে আর মুহাম্মদ চলছে একখন্ড মেঘছায়া মাথায় নিয়ে!! এমনকি তাঁর পাশের মায়সারাও রোদে জ্বলছে!! খাদিজা কি ভুল দেখছেন? এমনই তো দৃশ্যটা! মুহাম্মদ একা মেঘের ছায়ায়! বাকি সবাই রোদের ঘেরায়!! খাদিজা দেখলেন হঠাৎ এক বাঁদি চিৎকার করে বলছেঃ
-মালিকান! লক্ষ করেছেন? কী বিস্ময়কর দৃশ্য? মুহাম্মদের উপর রোদ নেই, সবার উপর রোদ?! মালিকান! মুহাম্মদ যেখানে ছায়াটাও সেখানে! এমনকি মুহাম্মদ নিচু হলে মেঘখন্ড-টাও নিচে নেমে আসছে! আয় আল্লাহ!!
ঘোরলাগা দৃষ্টিতে বিস্ময়-বিমুগ্ধ খাদিজা বাঁদির কথায় নিজের পর্যবেক্ষণের উপর আস্থা ফিরে পেলেও নীরব রইলেন, কোনো উত্তর করলেন না। তিনি কাফেলার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়েই রইলেন।
কাফেলা এসে থামলো। উটের দল বসতে লাগলো। লোকেরা ছুটোছুটি শুরু করে দিলো। ছেলে ছুটে গেলো বাবার দিকে। বাবা ছুটে গেলো ছেলের দিকে। কেউ-বা ভাইয়ের দিকে। শুরু হলো খোঁজ-খবর। স্বাগতিকরা জানতে চাচ্ছে, কে এলো আর কে এলো না। সফরের সময়টা কেমন কাটলো ... ইত্যাদি।


#Read_to_Lead