'জুমুআর বয়ানে সমকালীন বিশ্ব'



জুমআ। মুসলিম জাতির সাপ্তাহিক মিলনকেন্দ্র। শত ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মুমিনরা ছুটে আসে মসজিদপানে। জড়ো হয় মিম্বারের সামনে। শুনতে থাকে দ্বীনি আলোচনা। ওয়ারিশে আম্বিয়ার মুখনিঃসৃত মুক্তাতুল্য বাণিগুলো কুড়িয়ে নেয় । সাজিয়ে নেয় জীবনকে। গড়ে তুলে আখিরাতকে। নবী করীম ﷺ এর ইন্তিকালের পর থেকেই এই মহান কাজ প্রতি যুগে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী উলামায়ে কেরাম। তাঁরা মিম্বারের ধ্বনিতে আলোড়িত করেন মানুষের জীবন। আলোকিত করেন বিদ্ঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়া অন্তরাত্মাকে। নাড়িয়ে তুলেন পাপের ভারে জমে যাওয়া মনজগতকে। আন্দোলিত করেন উদাসীন মনকে। জাগিয়ে তুলেন ঘুমন্ত ব্যক্তিসত্ত্বাকে। মনে করিয়ে দেন জাতীয় চেতনা, দেশীয় গৌরব ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। তাঁরা অশ্লীলতায় ছেয়ে যাওয়া সমাজে ছড়িয়ে দেন সংশোধনী বার্তা। পৌঁছে দেন ঈমানের স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল বাণি।



জুমুআর এই খুৎবাহ মানবজীবনে বিস্তর প্রভাব ফেলে। ব্যাক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক, জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনা বজায় রাখতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই দ্বীনি বার্তা প্রচারকারী এই জুমুআর খুৎবাহ হওয়া চাই বিষয়ভিত্তিক, সারগর্ভপূর্ণ, সাজানো-গুছানো, মর্মস্পর্ষী ও যুগের চাহিদানির্ভর। সেই চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই নববী শিক্ষার সৎসাহস বুকে নিয়ে জাতির খেদমতে এগিয়ে এসেছেন মুফতি জাহিদুল ইসলাম। রচনা করেছেন 'জুমুআর বয়ানে সমকালীন বিশ্ব' নামের অমূল্য এই গ্রন্থ। বইটিতে ব্যাক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও ধর্মীয় নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে।



বইটি প্রকাশ করেছে এ-দেশের স্বনামধন্য অভিজাত প্রকাশনী 'আনোয়ার লাইব্রেরী'। ইসলামপ্রিয় রুচিশীল পাঠকদের কাছে খুবই প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একটি নাম। উম্মাহর খেদমতে যারা কাজ করে যাচ্ছেন সাধ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে। ইসলামের আলো বিলিয়ে চলেছেন শহরের অলি-গলি ও গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ--সর্বত্র।



৬২৪ পৃষ্ঠার এই বইটিকে সাজানো হয়েছে মোট 'ছয়টি অধ্যায়ে'। মূল্য সাধ্যের মাঝে। বাধাই, কভার, কাগজ সবই মানসম্মত, সন্তুষজনক।





বইয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে। বইয়ের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সালফে সালেহীন ও আকাবির উলামায়ে কেরামের মুক্তাতুল্য বাণিসমূহ এবং বিভিন্ন তাফসীর ও ব্যাখ্যাগ্রন্থের উদ্ধৃতি। আলোচনাকে বাস্তবতার নিরিখে মনে গেঁথে দিতে আনা হয়েছে নানা ঘটনা। বিষয় ভিত্তিক গোছালো আলোচনা বইয়ের সৌন্দর্যকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশ তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ; যা চিন্তাশীল যে-কোনো মনে মুগ্ধতা ছড়াবে। পাঠককে বইয়ে ধরে রাখতে এবং আলোচনা সহজে আত্মস্থ করতে আলোচ্য বিষয়ের ধারাবাহিকতা বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি।





সংক্ষেপে ছয়টি অধ্যায়ের পাঠপর্যালোচনা তুলে ধরছি:



* প্রথম অধ্যায়:[৩১-৩২৬]

গ্রন্থটির বিশাল এক অংশ জুড়ে আছে অধ্যায়টি। শুরু হয়েছে আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদ সম্পর্কীয় বিস্তর আলোচনা ও প্রামাণাদি উল্লেখের মধ্য দিয়ে। কুফর, শিরক ও বিদআত বিষয়ে এসেছে বিস্তারিত প্রামাণ্য পর্যালোচনা। নবী-রাসূল পরিচিতি, সংখ্যা ও আম্বিয়ায়ে কেরাম সংক্রান্ত অন্যান্য আকীদা, বিশেষত খতমে নবুওয়াত নিয়ে প্রামাণিক বিশ্লেষণ। মীলাদুন্নবীর পোস্টমর্টেম, স্বরুপ, দলিলনির্ভর খন্ডন ও ইতিহাস। ওরশের ভেতর বাহির। মি'রাজের প্রেক্ষাপট, মহাকাশ, ঐশী দলীল ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং অর্জন। মৃত্যুকালীন শান্তি ও যন্ত্রণা। শা'বান ও শবে বরাত--ফযীলত, বিভ্রান্তি, বাড়াবাড়ি ও করণীয়। রমজান, যাকাত, লাইলাতুল কদর, ইতিকাফ বিষয়ক তথ্যবহুল ইনসাফপূর্ণ আলোচনা। কুরআনের মাহাত্ম। হজ ও বাইতুল্লাহর পুননির্মাণ ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়। দুই ঈদ--করণীয় বর্জনীয়। কুরবানীর বিস্তর আলোচনা। হিজরী সনের তাৎপর্য, ইতিহাস এবং বিভিন্ন মাসের নির্দিষ্ট আমল ও ভ্রান্তি নিরসন। কারবালা ট্রাজেডি, নির্বাচন পদ্ধতি-ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি এবং রিজিক সংক্রান্ত বিভিন্ন দিকের আলোচনা।





* দ্বিতীয় অধ্যায়: ইবাদত[৩২৭-৩৭৬]

এতে ফাযায়েলে নামাজ তথা গুরুত্ব ও তাৎপর্য, স্বরুপ, দলিল, পুরস্কার এবং মাসায়েলে নামাজ তথা নামাজ সংক্রান্ত বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জামাআতের গুরুত্ব ও পরিত্যাগের শাস্তি এবং খুশু বিষয়ে মর্মস্পর্ষী আলোচনা এসেছে। রয়েছে জুমআ সংক্রান্ত বিস্তর আলোচনা।



* তৃতীয় অধ্যায়: মুআমালাত [৩৭৭-৪৩৬]

এই অধ্যায়ে উঠে এসেছে পিতা-মাতা ও সন্তান সম্পর্কীয় আলোচনা, লালন-পালনে করণীয় বর্জনীয় সহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য দিক। স্বাভাবিক চলাফেরায় আচার-আচরণের নানাদিক নিয়ে ইসলামি নির্দেশনাগুলো সহজে তুলে আনা হয়েছে। নারীবাদ, সমঅধিকারের এপিঠ ওপিঠ সহ এই বিষয়ের বেশ কিছু আলোচনা স্থান পেয়েছে। মানব অঙ্গের খেয়ানত, ময়নাতদন্ত, কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন ও রক্ত ক্রয় বিক্রয় সহ অন্যান্য কিছু মাসআলা আলোচিত হয়েছে।



চতুর্থ অধ্যায়: [ তাযকিয়ায়ে নাফস: ৪৩৭-৪৮৬ ]

এই অধ্যায়ে আত্মশুদ্ধির পরিচয়, হাকীকত, প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি এবং এই লক্ষ্যে সুহবতের অপরিহার্যতার ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা এসেছে। দুআ কবুলের মর্ম, পদ্ধতি, কবুল না হওয়ার কারণ এবং কবুল হওয়ার শর্তগুলো খুলে খুলে বর্ণনা করা হয়েছে।



পঞ্চম অধ্যায়: [ ইলম: ৪৮৭-৫১৬ ]

ইলমের মর্যাদা, ইলম না থাকার ভয়াবহতা, শেখার বিধান ইত্যকার বিষয়ে প্রামাণ্য আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত আলোচনা হয়েছে কওমী মাদরাসা বিষয়ক। কওমী মাদরাসার পরিচয়, প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, পদ্ধতি, মূলনীতি, অবদান এবং কওমী মাদরাসার আধুনিকায়ন, কওমী মাদরাসা ও জঙ্গি-সন্ত্রাস বিষয়ে।



ষষ্ঠ অধ্যায়: [বিবিধ]

এই অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে 'সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলাম' শীর্ষক শিরোনামের মাধ্যমে। এ-বিষয়ে হয়েছে নিরপেক্ষ তাত্ত্বিক আলোচনা। এরপর নানা দিবসের ইতিহাস, হাকীকত, পালনের বিধান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেমনঃ এপ্রিল ফুল, ভালোবাসা দিবস, মাতৃভাষা দিবস, শ্রমিক দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বাংলা নববর্ষ, ইংরেজি হ্যাপি নিউ ইয়ার সহ অন্যান্য 'ডে' সম্পর্কে। সর্বশেষ আলোচনা হয়েছে তাবলীগ জামাআতঃবিশ্ব ইজতেমা ও আখেরী মুনাজাত বিষয়ে।







'একের ভেতর সব' এবং গ্রহণযোগ্য ও উপকারী নানা গুণে বিশেষিত হওয়ায় অল্প সময়েই পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে গ্রন্থটি। মিম্বারের সীমানা পেরিয়ে খুৎবার আলোকময় কন্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ুক জীবন, সমাজ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল--সর্বত্র!


'আনোয়ার লাইব্রেরী'

বই: জুমুআর বয়ানে সমকালীন বিশ্ব
লেখক : মুফতী মুহাম্মদ জাহীদুল ইসলাম
প্রকাশনী : অানোয়ার লাইব্রেরী
বিষয় : প্রয়ােজনীয় , ব্যক্তিগত , পারিবারিক , সামাজিক ও আন্তর্জাতিক
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৬২৪
'মুদ্রিত মূল্যঃ ৭০০টাকা'

রিভিও লেখকঃ রিফাত হাসান