#বুক_রিভিউ

 
                   বাংলায় বাজে গির্জার বাঁশি

আমরা মুসলিম জাতি। আমাদের প্রেরণের আছে এক মহান উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য আমরা আজ ভুলতে বসেছি। তাই যেই আমাদের হবার কথা ছিল পথভোলা মানুষের দাঈ, সেই আমরাই আজ বিধর্মীদের 'মাদঊ' তে রুপান্তরিত হয়েছি। নবীর উত্তরসূরী দাবি করে আমরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছি। নামাজ,রোজা করে কোনোমতে দিনকাল পার করেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি।

অথচ উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম--সমগ্র বাংলাদেশে কুচক্রীদের অপতৎরতা বর্ণনাতীত বেড়ে চলেছে। আগামী পঞ্চাশ বছর পর আপনার-আমার ঘরে দু'একজন করে খৃষ্টান সদস্য থাকলে অস্বাভাবিক কিছুই হবে না। মিশনারী ও এনজিওদের কালো থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরলমনা মানুষগুলো। তারা কোনো সাতেপাঁচে নেই, সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। অতি লোভ নেই। অল্পে তুষ্টির গুণে তারা সবাই প্রশংসার দাবিদার। সেসব এলাকায় গাছের প্রতিটি পাতা থেকেও যেন দারিদ্রের গন্ধ আসে। পশ্চিমা শ্বেত ভল্লুকেরা তাদের এই দরিদ্রতা ও ভালোমানুষির সুযোগটাই নিচ্ছে।

তাদের ধর্মবিধ্বংসী এসব অসৎ কর্মকান্ডের ফিরিস্তি শুনলে আমাদের অন্তরগুলো কেঁদে উঠে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সেই রক্তক্ষরণ ও তার যন্ত্রণা কলমের অশ্রুতে রুপান্তরিত হয়ে অস্তিত্বে এসেছে 'বাংলায় বাজে গির্জার বাঁশি' বইটি। বইটি লিখেছেন উদ্যমী তরুণ আলিম ও দাঈ উমর আলী আশরাফ। (বারাকাল্লাহু ফী হায়াতিহী!) বইটিতে তিনি তার দাওয়াতী এবং ব্যক্তিগত সফরের বাস্তবচিত্র খুব দরদমাখা বর্ণনায় তুলে ধরেছেন।

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি পেশ করে অন্য ধর্মগুলোর তথ্যবিকৃতি ও ধর্মবিকৃতির বর্ণনা তুলে ধরেছেন।তিনি যেমন মিশনারী ও এনজিওদের সমস্যা তুলে ধরেছেন, তা থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দিয়েছেন। পরিস্কার করেছেন হিন্দুধর্মের অসারতা, উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইসলাম সমর্থনে বিভিন্ন অমুসলিম স্কলারদের। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন এনজিওগুলোর নগ্নথাবার বাস্তবচিত্র।

খৃষ্টানদের সমস্ত অপকর্মের ফিরিস্তি টাঙিয়ে এ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অগণিত গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তবে এই বইটিতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে খৃষ্টবাদ,পৌলবাদ,ইহুদি,হিন্দু,বৌদ্ধ, উপজাতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে কমবেশ আলোচনা হয়েছে।
বইটি আপনাদের বলবে--শ্বেত ভল্লুকেরা কীভাবে ধর্ম নিয়ে প্রতারণা করছে, অর্থের লোভ দেখিয়ে, দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে, নানান মিথ্যাচার ও অপকৌশলে আমাদের সরলমনা ভাই-বোনদের ঈমান নামক মহামূল্যবান সম্পদটি হাতিয়ে নিচ্ছে! কোমলমতি শিশুদের মনে শিক্ষার ছদ্মবরণে রোপণ করছে খৃস্টবাদের বীজ!

বইটিতে এমন এমন ভয়ানক সব তথ্যের উপস্থিতি আছে, যা ঈমানী নূরের মশালধারী তো দূর কী বাত--নিভু নিভু ঈমানের অধিকারী যে-কারো চোখের পানি ঝরাতে বাধ্য। লেখক সেসব অসহায় মানুষগুলোর ধর্মান্তরিত হবার কিছু যৌক্তিক কারণও তুলে ধরেছেন আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে--
মিশরনারীগুলো তাদের দূর্বল জায়গুলো নিয়ে খেলে। আবেগের মূলপয়েন্টগুলোতে ঢিল ছুড়ে। সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে দারিদ্রই সেসব অঞ্চলের নিত্য বন্ধু। তারা নিজেদের মুখে খাবার উঠাতে পারে না। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা সবকিছু থেকেই তারা বঞ্চিত। তাই এসবে যারা তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, পেটের দায়ে পড়ে বিনিময় স্বরূপ নিজের ঈমানটা তাদের হাতে দিয়ে আসে। দায়টা কার? খেতে না পাওয়া সেসব অক্ষরজ্ঞানহীন হতদরিদ্রদের নাকি আমাদের?
খৃষ্টানরা উড়ে এসে জুড়ে বসে কতকিছু করছে, আমরা ঘরের ছেলে ঘরে বসতে পারছি না! এ লজ্জা কোথায় রাখি? ঈমানের দূ্র্বলতা কীসে ঢাকি!

বইটা আপনাকে উম্মাহর দরদে কাঁদাবে, কাঁদতে বাধ্য করবে। যতই পাথরে গড়া কঠিন হোক আপনার মন, মনোযোগ দিয়ে বইটি পড়তে থাকলে সরলমনা মানুষগুলোকে জাহান্নামের পথে নিয়ে যাওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনাগুলো আপনাকে কাঁদতে বাধ্য করবে। মুসলিম তাবলীগ জামাত পেয়ে তাদের অসহায়ভঙ্গিতে বলা আবেগমাখা কথাগুলো আপনাকে শিহরিত করবে। শরীরের লোমগুলো দাড়িয়ে যাবে। বাকরুদ্ধ হবেন আপনি। আহ! আমরা কতই না সুখে আছি।

বইটা আপনাকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে দেবে--
এখনো এরশাদকে প্রধানমন্ত্রী মনে করা ও শেখ মুজিবকে নবী মনে করা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষগুলো এসব অতিভক্তি থেকে করছে বলে আপনার মনে হয়? তাদের কানে এরশাদের পরের আর কারো নামই পৌছেনি। আর নবী বলতে তারা বুঝে কেবল মহাপুরুষ জাতীয় কাউকে। সে হিসেবে তারা শেখ মুজিবেরই নাম শুনে এসেছে। এসবের দায় কার? তাদের নাকি আমাদের? যেসব আত্মোৎসর্গকারী দাঈ ঘুরে বেড়াচ্ছেন এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে, শ্বেত ভল্লুকেরা তাদের বিরূদ্ধেও ঠুকে দিচ্ছে নানা মিথ্যা মামলা। নিজেদের ঘরে নিজেরাই মুখ ফুটে কথা বলতে পারি না!

লেখক নিঃসংকোচে বলে গেছেন আমাদের অবহেলার কথা। নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন রাস্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাগত দূর্বলতা ও দূর্নীতির কথা। সাহসভরা বুকে লিখে গেছেন সেসব এলাকার একসময়ের ভাড়াটে উপজাতিগুলোর দেশদ্রোহী কার্যকলাপের কথা। ইংরেজরা ঠোঙাভর্তি জোঁক এনে সারাবাড়িতে ছিটিয়ে দেওয়ার মতো করে শত শত পাদরি এনে ছড়িয়ে দিয়েছিল এদেশে। জোঁক যেমন রক্ত চুষে, তেমনি এরা চুষে বেড়াচ্ছে মানুষের ঈমান ও বিশ্বাস।

বইটি আপনাকে জানাবে ধর্মপ্রচারের স্বার্থে তারা কী পরিমাণে আত্মত্যাগ করে যাচ্ছে--সেসব কথা। আহ! বিবেকের বন্ধ দুয়ারে খটখট আওয়াজ করে যায় কথাগুলো! ওরা ধর্মান্তরের স্বার্থে বর্ণাতীত কষ্ট করে যাচ্ছে, স্বদেশ ছেড়ে-আরাম আয়েশ ছেড়ে সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসে পড়ে আছে, অথচ আমরা!

বইটি আপনাকে জানাবে ব্যক্তির পার্থক্যে দাওয়াতের পার্থক্যের হিকমাহপূর্ণ পদ্ধতি। দেখাবে এত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তাদের ধর্মপ্রাণ থাকার কিছু হৃদয়স্পর্শী চিত্র। বলবে তাদের অজ্ঞাতসারে আকীদার ভয়ংকর সব বিভ্রান্তির কথা। কাঁদাবে আপনাকে সেসব এলাকার মানুষের ধর্মশূণ্যতার ভয়াবহতা।

'আমরা গরীব বলে কী আমাদের ঈমানের মূল্য নেই! অপারগ হয়ে আমাদের ঈমানগুলো তুলে দিতে হয় শ্বেত ভল্লুকদের হাতে।
-হুজুর! আমাদের কাদের হাতে রেখে যাচ্ছেন? আপনারা চলে গেলে আমাদের ঈমানের কী হবে হুজুর! আমাদের উদ্ধার করেন হুজুর! আমরাও তো মুসলমান!' বইয়ের পরতে পরতে উল্লেখিত তাদের এসব কান্নামাখা কথাগুলো আপনাকে আমাকে গলাছেড়ে কান্না করতে সাহায্য করবে। ছলে,বলে কৌশলে কীভাবে টেনে হেচড়ে জাহান্নামে নিয়ে যাচ্ছে আমার-ই ভাইবোনদের! আহ!

দাওয়াতী সফরের ফাকে ফাকে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সেসব এলাকার সাদামাটা গ্রামীনচিত্র। তুলে ধরেছেন সেসব এলাকার ভয়াবহ দারিদ্রের কথা।

নিজের অভিজ্ঞতা ও পত্রিকার বিভিন্ন রেফারেন্স বইটির গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া শুরুতে যুক্ত করা হয়েছে আমাদের সকলের সুপরিচিত উম্মাহর দরদি দাঈ মুফতি যুবায়ের আহমদ দা. বা. এর গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা।

বইটি আপনাকে জানাবে বিভিন্ন সময়ের জরিপে উঠে আসা নানা পরিসংখ্যান। আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিবে এমন সব অঞ্চলের সাথে, যেখানে মানুষ মুসলমান হয়েও শ্বেতভল্লুকদের ভয়ে সেই পরিচয়টুকু দেবার সাহস করে না। জ্বী! অঞ্চলগুলো এদেশের বাহিরের নয়, ৯০% মুসলমানের এই বাংলাদেশেই। আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিবে এমন এক বাহিনীর সাথে, যারা শান্তিবাহিনী নামে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে। ভিনদেশী হয়েও তারা এতটা ক্ষমতাধর যে, আমাদের সবচে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও তাদের ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। ভাবছেন, ভুলে অন্য কোনো দেশের খবর লেখক এখানে লিখে দিয়েছে? না, এটি আমাদের সোনার বাংলারই কথা।

ভাবছেন, আমরা কী এতটা কষ্ট করতে পারব? আমাদের দিয়ে এসব হবে? বইটি পড়েই দেখুন! বইটি কোনো কাল্পনিক উপন্যাস নয়। লেখকের নিজেরই দাওয়াতী সফরনামা বইটি। লম্বা বৃন্তের কচকচে পান মুখে পুরে আমরা যখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলছি; আমরা তো নিয়মিত আজান দিয়ে নামাজ পড়তে পারছি, আর কী চাই? ঠিক সেই মুহুর্তে গুটিকতক উম্মাহদরদী দাঈ ঘুরে বেড়াচ্ছেন বনে জঙ্গলে, মানুষের দ্বারে দ্বারে,বারে বারে। তেমনি এক দাওয়াতী সফরনামা নিয়ে লেখা বইটি।

বাদামি রঙের প্রচ্ছদ। এর উপরে কালো রঙে আকা প্রিয় বাংলার অর্ধেকটা মানচিত্র। শ্বেতভল্লুকদের হীনচক্রান্ত চলছে এই অর্ধেকটা নিয়েই। কালো মানচিত্রটা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাল রঙের ক্রুশচিহ্ন। সব মিলিয়ে প্রচ্ছদ প্রশংসার দাবিদার। পুরো বইয়ের বিষয়বস্তু খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে প্রচ্ছদে। গুণগত মানও বেশ উন্নত। হার্ড কভার, মজবুত বাইন্ডিং, ভালোমানের পৃষ্ঠাসজ্জা ও ভেতররে পাতা সমালোচকদের মুখ খোলার সুযোগটুকু রাখেনি।

বইটি এক,দুই,তিন,চার,পাঁচ করে পাঁচটি পর্বে ভাগ করা। আর প্রতিটি পর্ব ক,খ,গ,ঘ..... পরিচ্ছেদে অভিনব এক পদ্ধতিতে সেজেছে। তাই পড়তে গিয়ে ক্লান্তিভাব আসবে না। বিরক্তি আসবে না। বইয়ের পরতে পরতে যেসব হৃদয়স্পর্ষী আলোচনা উঠে এসেছে, এগুলো পাঠককে 'ক্লান্তি-বিরক্তি-বিশ্রাম' এসব কথাই ভুলিয়ে দিবে। আমি এক বসায় দীর্ঘ সময় নিয়ে টানা পড়ে শেষ করেছি। এক বসায় পড়ার মতো বই-ই এটি। পড়তে পড়তে আলোচিত দৃশ্যগুলো আপনার চোখেও ভাসবে। আপনি জাগবেন। ভাববেন। কাঁদবেন। নিজেরও কিছু করা দরকার বলে প্রস্তুতি নিবেন।

বুলি কপচানো না, পড়লে আপনাতেই খুব গভীরভাবে টের পাবেন। আপনার চোখ খুলে দেবার জন্যই বইটি।

বই : বাংলায় বাজে গির্জার বাঁশি
লেখক : Omar Ali Ashraf
সম্পাদনায় : আশরাফুল হক
ভূমিকা : মুফতি যুবায়ের আহমদ (দাঈ)
প্রকাশনা : বইকেন্দ্র
প্রচ্ছদ : আবুল ফাতাহ
প্রুফ সংশোধন : জাবির মুহাম্মদ হাবীব
পৃষ্ঠাসজ্জা : যোজন আরিফ
গায়ের মূল্য : ১২৫ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৫২

#বইকেন্দ্র_পাঠান্তর_রিভিউ