বই - প্যারাডক্সিকাল সাজিদ - ২
লেখক - আরিফ আজাদ
মুদ্রিত মূল্য - ৩৬৯৳
প্রাপ্তিস্থান - wafilife.com

ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে বর্তমান সময়ে মানুষের চিন্তা-চেতনা আর আদর্শ সর্বত্র পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই। প্রযুক্তির এই ধারা কাজে লাগিয়ে ধর্মবিদ্বেষী একদল মানুষ ইসলাম, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা এবং নবীজী মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে এমন সব কথা ছড়াতে থাকে, যা মুখ বুজে সহ্য করা যেকোনো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত কঠিন। অসচেতন মুসলিম তরুণদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে তাদের ধর্মবিমুখ করার লক্ষ্যে তারা আপ্রাণ কাজ করে যাচ্ছে, আর সফলও হতে পেরেছে অনেকটাই।
কলমের জবাব কলমে আর যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়েই দিতে লেখক আরিফ আজাদ নিয়ে এসেছেন সাজিদ চরিত্রটি। পৌঁছাতে চেয়েছেন তাদের কাছে, যাদের খুব বেশি জানাশোনা নেই ধর্ম সম্পর্কে; কিন্তু ধর্মবিদ্বেষীদের ছড়ানো প্রোপাগাণ্ডায় নিজের বিশ্বাস নিয়ে হয়ে পরেছে সন্দিহান।

এই বইতে আছে নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাব, আছে খ্রিস্টান মিশনারিদের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবও। এর পাশাপাশি স্থান পেয়েছে কুরআনের অলৌকিক কিছু ব্যাপার, ভাষাতাত্ত্বিক মিরাকল, যা মানুষকে সত্যিই বিস্মিত করবে; কুরআনের প্রতি সৃষ্টি করবে গভীর ভালোবাসা।

'বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ড - ঘটনার পেছনের ঘটনা' - চ্যাপ্টারটিতে দেখা যায় নাস্তিকরা কিভাবে এই হত্যকান্ডকে অমানবিক আখ্যায়িত করে নবীজী মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর মানবতাবিরোধী অপরাধের দোষ চাপায়, যেখানে সাজিদ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তাদের শাস্তি আসলে তাদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল অনুযায়ীই হয়েছে, বেড়িয়ে আসে আসল ঘটনা। বিপরীতে, নাস্তিকতার মূল ভিত্তি ডারউইনবাদ যে বস্তুবাদীদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় হত্যাযজ্ঞগুলো চালাতে উদ্বুদ্ধ করেছে, সেটা উঠে এসেছে 'গল্পে জল্পে ডারউইনিজম' অধ্যায়ে।

ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার এবং নারীদের সম্মান - উঠে এসেছে পৃথক দুটি অধ্যায়ে।
আছে কুরআনের বৈপরীত্য আর স্যাটানিক ভার্সেস বিষয়ে আলোচনার সত্যাসত্য।
সংক্ষিপ্ত আলোচনা আছে 'ইলুমিনাতি' বিষয়ে।
নাস্তিকদের আলোচনার মুখরোচক বিষয় নবীজী (সাঃ)-এর বহুবিবাহের পেছনে যৌক্তিক কারণগুলো আলোচিত হয়েছে 'রাসূলের একাধিক বিবাহের নেপথ্যে' অধ্যায়ে।

'জান্নাতেও মদ?', 'কুরআন কেন আরবী ভাষায়', 'সমুদ্রবিজ্ঞান', 'পরমাণুর চেয়েও ছোট' আর 'সূর্য যাবে ডুবে' - অধ্যায়গুলো বারবার প্রমাণ করেছে কুরআনের অলৌকিকতা, মাহাত্ম্য। আল-কুরআন যে বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহতালার বাণী, কোন মানুষের রচনা নয়, তা যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের পক্ষেই স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব এই অধ্যায়গুলো পড়ে। সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকার, পরমাণুর চেয়ে ছোট ইলেক্ট্রনের অস্তিত্ব আর সূর্য যে ভবিষ্যতে আলো-তাপ হারিয়ে শ্বেতবামনে পরিণত হবে সেই তথ্য - যা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলো হাল আমলে, এগুলো সবই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে বলে দিয়েছেন ১৪০০ বছর আগেই, যা কেবল এগুলোর স্রষ্টার পক্ষেই জানা সম্ভব।

'লেট দেয়ার বি লাইট' অধ্যায়ে উঠে এসেছে কিভাবে প্যাগানদের দেবতা 'মিথ্রাস' এর জন্ম তারিখ ২৫শে ডিসেম্বর হয়ে গেছে খ্রিস্টানদের ঈশ্বর যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন, আদতে যে তারিখের আশেপাশের কোনো তারিখেও তিনি জন্ম গ্রহণ করেন নি! ইতিহাসের প্রমাণ আর যুক্তিতে হেরে যাওয়া খ্রিস্টান অ্যালেন এ পর্যায়ে বলে, যে কারণেই হোক যেহেতু ক্রিসমাস ডের রিচ্যুয়াল চলে আসছে, তা পালন করে যাওয়াই উচিত। দাবি তোলে, মোটামুটি সব ধর্ম, এমনকি ইসলামেও নাকি এরকম রিচ্যুয়াল পাওয়া যায়! দাবি জানায় নন-ইসলামিক সোর্স থেকে কাবার অস্তিত্বের ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণের। সাজিদ তাও প্রমাণ করে নন-ইসলামিক সোর্স থেকেই!

আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি 'নিউটনের ঈশ্বর' অধ্যায়টি পড়ে। বিজ্ঞানী নিউটন সম্পর্কে এমন সব তথ্য এখানে উঠে এসেছে, যা ষড়যন্ত্র করে মানুষের থেকে আড়ালে রাখা হয়েছে। উঠে এসেছে - একজন আগাগোড়া খ্রিস্টান হয়েও বিজ্ঞানী নিউটন ক্যানো চার্চের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন, কলমযুদ্ধ চালিয়েছিলেন বিকৃত ক্রিশ্চিয়ানিটির বিরুদ্ধে, ঈশ্বরের অবস্থা বোঝানোর জন্য আবিষ্কার করেছেন মোট ১২টি সূত্র, যিশু খ্রিস্ট তথা ঈসা(আঃ) ঈশ্বর হিসেবে না মেনে মেনেছেন শুধু মাত্র ঈশ্বরের দূত হিসেবে, যা ইসলামের সাথে মোটামুটি পুরোটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সবশেষে, সাজিদকে প্রতিনিয়ত 'মি. আইনস্টাইন' বলে ব্যঙ্গ করা তার শিক্ষক মুহাম্মদ মফিজুর রহমান, যে ঘোর অবিশ্বাসী লোকের সাথে সাজিদের সবসময় চলতো ঠাণ্ডা যুদ্ধ, তার বিশ্বাসী শিবিরে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টার চিঠি আপনার দুই নয়নকে করতে পারে অশ্রুসিক্ত।

ইসলামের বিপরীতে ধেয়ে আসা যুক্তির ভঙ্গুরতা, প্রশ্নগুলোর অবান্তরতা খুব সহজ-সরল ভাষায় লেখক আরিফ আজাদ তুলে ধরেছেন। কুরআনের অনন্যতা আর নবীজী (সাঃ) এর নব্যুওয়াতের সত্যতার সব অকাট্য প্রমাণ এক জায়গায় করে মানুষের অন্তরে বইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন বিশ্বাসের ফল্গুধারা।