★★ গ্রন্থালোচনা ★★
.
প্রাথমিক তথ্য
______________
বই: মরা লোক কথা বলে
লেখক: ইমাম আবু বকর বিন আবিদ্দুনিয়া
অনুবাদক: মাওলানা মুহাম্মদ নূরুল
সম্পাদক: মাওলানা আ খ ম ইউনুস
প্রকাশক: আল হিকমাহ পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ: আমিনুল ইসলাম আমিন
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৯৬
মূল্য: ৭৫ টাকা মাত্র।
.
সংক্ষিপ্ত কথা
_____________
বইয়ের নামটাই কেমন লোমহর্ষক— মরা লোক কথা বলে! এও সম্ভব? এটা তো কেবল ভৌতিক কাহিনিতেই সম্ভব! অন্যথায় মরা লোক কীভাবে কথা বলবে?
হ্যাঁ, মরা লোকও কথা বলে, এটা সম্ভব এবং বাস্তব! আল্লাহর কুদরতের কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। পৃথিবীর শুরু থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক মানুষ মৃত্যুর পরও কথা বলেছে! এমনকি বেশ কয়েকজন অনেক বছর জীবনযাপনও করেছে! তাদের সেই অত্যাশ্চর্য ও লোমহর্ষক কাহিনিই বর্ণিত হয়েছে 'মরা লোক কথা বলে' বইটিতে।
ইমাম আবু বকর বিন আবিদ্দুনিয়া রাহিমাহুল্লাহর 'মান 'আশা বা'দাল মাওত' গ্রন্থটি 'হায়রাত আঙ্গীয ওয়াকেয়াত' নামে উর্দুতে প্রকাশিত হয়েছিল। আর উর্দু থেকে 'মরা লোক কথা বলে' নামে বাংলায় প্রকাশ হয়েছে।
এটি আল্লাহর ওলি, শহিদ, বুজুর্গ ও আযাবপ্রাপ্ত লোকদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনে আলমে বরযখের চাক্ষুষ করা ঘটনার বিবরণ। নেককারদের প্রতি আল্লাহর দয়া, শহিদদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত, গুনাহগারদের প্রতি আযাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে মৃত লোকদের মুখ-নিঃসৃত বিস্ময়কর ঘটনাবলীর ঈমানদীপ্ত কাহিনি 'মরা লোক কথা বলে।' বইটিতে আছে প্রায় সাতাত্তরটা গল্প।
.
লেখক পরিচিতি
_______________
ইমাম আবু বকর বিন আবিদ্দুনিয়া রাহিমাহুল্লাহ ২০৮ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বহু গ্রন্থ প্রণেতা এবং বিখ্যাত ইমাম ছিলেন। ছিলেন তৎকালীন বহু রাজপুত্রের শিক্ষকও! লিখেছেন আশ্চর্য আশ্চর্য কিতাবাদি। তাঁর মরা লোক কথা বলে বইয়ে আছে পরকাল বিশ্বাসীদের জন্য শিক্ষা এবং প্রেরণা; সাথে সাথে আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ।
.
বিস্তারিত রিভিউ
_______________
মারা যাওয়ার পরও জীবিত হওয়া— পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রচুর আছে! আমরা হয়তো বা তেমন জানি না! আবার চোখ ফেরালে দেখব, আমরাও এমন ঘটনা জানি!
খোদ কুরআনেই প্রায় চারটা এমন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে! উযাইর আলাইহিসসালামের ঘটনা, মুসা আলাইহিসসালামের সঙ্গী বনি ইসরাইলের সত্তরজন নেতার ঘটনা, বনি ইসরাইলের অন্য এক ব্যক্তির ঘটনা এবং হিজকিল আলাইহিসসালামের সময়ে একইসঙ্গে হাজারো ব্যক্তির মৃত্যু ও জীবিত হওয়ার ঘটনা— এগুলো আমরাও জানি, কুরআনে আছে! এছাড়া ইসা আলাইহিসসালাম 'কুম বিইযনিল্লাহ' বললে যে মৃতরা জীবিত হয়ে যেত, এটাও কুরআনে আছে।
এমন ঘটনা পৃথিবীতে নিতান্তই কম ঘটেনি। আল্লাহর কুদরতে সবকিছুই সম্ভব! বিশ্বাসীদের জন্য এতে আছে পর্যাপ্ত শিক্ষা।
প্রথম যুগের মানব কাবিল সম্পর্কে আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনাচ্ছেন আবদুল্লাহ ইয়েমেনি রাহিমাহুল্লাহ। তিনি সামুদ্রিক সফরে ছিলেন, মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ফলে অন্ধকার সমুদ্র! পানীয় জলের অভাব; কিন্তু অন্ধকারে তীরের খোঁজ মিলে না। আকাশ পরিষ্কার হওয়ার পর তারা তীরে জাহাজ ভিরিয়ে পানীয় জলের সন্ধানে বেরুলেন। কিছুদূর গিয়ে দেখলেন দুইজন অশ্বারোহী আসছে। তাদেরকে পানির কথা বলতেই তারা বলল, পাশের কুয়োতে পাবে। তবে আশ্চর্যজনক কিছু দেখলে ভয় পেয়ো না। তিনি সেই কুয়োর পারে গিয়ে দেখেন, একজন মানুষকে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে! শেষপর্যন্ত সে তার পরিচয় দিল, সে কাবিল! এ অদ্ভুত আশ্চর্যজনক ঘটনাটি বইয়ের ৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।
নুহ আলাইহিসসালামের ছেলে 'সাম' ইসা আলাইহিসসালামের মোজেজার মাধ্যমে জীবিত হয়ে গিয়েছিলেন! কুরআনে বর্ণিত— উযাইর আলাইহিসসালাম মৃত্যু কী জিনিস— সেটা বুঝতে চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁর আশা পূর্ণ করেন। তিনি একশো বছর মৃত থাকার পর জীবিত হন এবং কথাও বলেন, জীবনযাপনও করেন!
বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। কিন্তু হত্যাকারীকে খুঁজে পাওয়া যায় না। লোকেরা মুসা আলাইহিসসালামের কাছে গিয়ে বিষয়টা বলে। তিনি আল্লাহর আদেশ জানিয়ে দেন, গাভী কুরবানি করে মৃত ব্যক্তির শরীরে গোশত ছুঁয়ালে সে হত্যাকারী সম্বন্ধে বলে দেবে। শেষপর্যন্ত সে জীবিত হয়ে কথা বলে— হত্যাকারী সম্পর্কে বলে দেয়।
মুসা আলাইহিসসালামের সঙ্গে বনি ইসরাইলের নেতৃবৃন্দ তুর পাহাড়ে যেতে চায়— তারা আল্লাহকে দেখবে! কিন্তু আল্লাহর নুরের তাজাল্লিতে তারা সবাই মারা যায়! পরে মুসা আলাইহিসসালামের আবেদনের প্রেক্ষিতে সবাইকে জীবিত করা হয়। এই ঘটনাও কুরআনে বর্ণিত।
মৃত্যু বড় ভয়ঙ্কর বিষয়! এ থেকে কারো রেহাই নেই। কিন্তু বনি ইসরাইলের কিছু নির্বোধরা মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে! তারা ছিল কয়েক হাজার! আল্লাহ তাদের সবাইকে রাস্তায়ই মৃত্যু দিয়ে দেন। হিজকিল আলাইহিসসালাম যাচ্ছিলেন এই রাস্তা দিয়ে। তিনি আল্লাহর কাছে তাদেরকে জীবিত করার আবেদন করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন— তারা জীবিত হয় এবং আরো অনেকদিন বাঁচে। এটাও কুরআনেরই ঘটনা।
আল্লাহ তাআলা শহিদদেরকে জীবিত বলেছেন। বলেছেন, তোমরা তাঁদেরকে মৃত বলো না। বাস্তবেই যে তারা জীবিত, এমন কিছু প্রমাণ উঠে এসেছে বইটিতে। এ সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এ বইয়ে। তন্মধ্যে চমৎকার কয়েকটি শিরোনাম— 'একজন শহীদ বলল রাব্বে কা'বার কসম, আমরা জীবিত'; 'শহীদ মুজাহিদরা জীবিত মুজাহিদকে ঘরে পৌঁছে দিলেন'; 'শহীদ বন্ধুর জীবিত মুজাহিদ বন্ধুর বিবাহ পড়ানোর জন্য উপস্থিত হওয়া;' 'শহীদ ব্যক্তির সঙ্গীর সাহায্যে আগমন;' ইত্যাদি।
এমন একটি ঘটনা আমাদের ভারতবর্ষেও ঘটেছিল। তিনি ছিলেন ইসমাইল শহিদ রাহিমাহুল্লাহ। জিহাদের ময়দানে এক শত্রুকে বলেছিলেন, খোদার কসম! আমি তোমাকে হত্যা করবই! কিন্তু হায়! একটা কাফের তাঁর মাথা শরীর থেকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলল! তবে আল্লাহর কুদরত বোঝা বড় দায়! তিনি মাথা ছাড়াই ওই কাফেরের পিছনে দৌঁড়ুলেন এবং তাকে হত্যা করলেন! আল্লাহ তাঁর বন্ধুদের কথা সত্যে রূপান্তরিত করে থাকেন।
শহিদদের ঘটনা ছাড়া বিভিন্ন গুনাহগারের আযাবে পতিত হওয়ার ঘটনাও আছে বইটিতে।
এমনতরো সাতাত্তরটি ঘটনা কুরআন হাদিস এবং ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী বিবৃত হয়েছে 'মরা লোক কথা বলে' বইটিতে। এগুলোর মাধ্যমে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে ঈমানের খোরাক এবং আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ।
.
পাঠ প্রতিক্রিয়া
______________
একসময় ভূত এফএম শোনার জন্য রাত জেগে বসে থাকতাম। প্রায় রাতেই এমন এক দুইটা ঘটনা থাকত যে, মৃত লোক ওঠে বসে গেছে বা হাসপাতালের মর্গে মৃত লোককে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেছে! (হাহাহাহাহা... এগুলো স্রেফ বানানো গল্প— জানার পর আর ভূত এফএম শুনি না।)
তবে এমন ঘটনা হঠাৎ ঘটেও! বিশেষকরে পূর্বযুগে আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ প্রায়ই ঘটত। মোজেজা, কারামত আগের যুগে অনেক বেশি প্রকাশ পেত। এখনও মুজাহিদদের ব্যাপারে এসব সংঘটিত হয়। আমরা যারা 'আফগানিস্তানে আমি আল্লাহকে দেখেছি' বা 'আফগানিস্তানে আমার দেখা আল্লাহর নিদর্শন' বইদুটো পড়েছি, তারা জানি, মুজাহিদদের কাছে কুদরতের অনেক বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আর পূর্বযুগে তো কাফেররা সরাসরি নবিদের কাছে মোজেজা চাইত। তখন আল্লাহ মোজেজা প্রকাশ করতেন।
যাইহোক, অসাধারণ কিছু গল্পের সমষ্টি হল 'মরা লোক কথা বলে।' গল্পগুলো কুরআন হাদিস এবং ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী লেখা হয়েছে। তাই পড়তে পারেন সকলেই।