ফেরা

লেখক : নাইলাহ আমাতুল্লাহ, সিহিন্তা শরীফা

প্রকাশনী : সমকালীন প্রকাশন

বিষয় : অন্ধকার থেকে আলোতে



ফেরা
-- সিন্তিহা শরীফা ও নাইলাহ আমাতুল্লাহ
--------------------------------------------------------

[রিভিউ লেখক : আরিফ আজাদ ]

মানুষের জীবনটা বড্ড রহস্যময়। জীবনের গতিপথ কখন কোনদিকে মোড় নেয় সেটা কেউই আগ থেকে আঁচ করতে পারেনা। না পারাটাই স্বাভাবিক। মানুষ তো ভবিষ্যৎ জানেনা। ভবিষ্যৎ জানেন কেবল একজনই। স্রষ্টা।

মোড় নেওয়া, মূহুর্তে মূহুর্তে গতিপথ পরিবর্তন করা জীবনের সময়গুলো তার পেছনে অসংখ্য, অজস্র গল্প, স্মৃতি রেখে যায়। এঁকে যায় নানানরকম পদচিহ্ন। এর কোনটা সুখের, কোনটা দুঃখের, কোনটা বিরহের। কোনটা প্রাপ্তির, কোনটা হতাশার। কোনটা বিজয়ের, কোনটা আবার অস্তিত্ব রক্ষার। কোনটা বিশ্বাসের আর কোনটা অবিশ্বাসের। এর মাঝেই জীবন কাটে। অন্তিম সময়টা ঘনিয়ে আসে। একসময় সব ফিকে হয়ে যায়। বরণ করে নিতে হয় চরম এক মহাসত্যকে। মৃত্যু!!

অত্যাশ্চর্যভাবে মোড় নেওয়া এরকম নানান গুণীজনের গল্প আমি পড়েছি। কিন্তু, যে গল্পটির কথা নিয়ে আজ লিখছি, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প। গল্প বললে ভুল হবে। বলতে হয় সত্যকে ফিরে পাবার কাহিনী।

গতবছরের শুরুর দিকে সাদা মলাটের একটি বই হাতে আসে। বইটির নাম 'ফেরা...'।
বইটা হাতে পাওয়া মাত্রই উল্টাতে থাকি। প্রথম কয়েক পাতা পড়ে কেমন যেন ঝিমুনি আসতে লাগলো। মজা পাচ্ছিলাম না। ধৈর্য্য ধরে আরেকটু আগালাম। মনে হলো,- 'এই তবে শুরু..............'

লোকটা মুসলিম। পছন্দ করে বসেন একজন খ্রিষ্টান মেয়েকে। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব। মেয়ের পরিবারে প্রস্তাব পাঠানো হলো।
মেয়ের পরিবার আবার রক্ষণশীল ক্যাথলিক। সিনেমায় সাধারণত দেখা যায়, নায়ক বলে থাকেন- 'ভালোবাসা মানে না ধর্ম বাঁধা।'
কিন্তু এটি সিনেমা নয়, একদম জীবনঘনিষ্ঠ ব্যাপার। মেয়ের পরিবারের শর্ত- বিয়ে করতে হলে ছেলেকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হতে হবে।
ছেলে আবার নায়কের মতো। মেয়েটাকে পাওয়ার জন্য স্ব-ধর্ম কেনো, জীবনটাও দিতে প্রস্তুত। তবে, এক্ষেত্রে জীবন নয়, স্ব-ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেই তিনি গ্রীন সিগনাল পেয়ে যাবেন।
ব্যস! ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে তিনি গ্রহণ করলেন খ্রিষ্টান ধর্ম।

তাদের বিয়ে হলো। তাদের দুই মেয়ে। আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো। খ্রিষ্টান পরিবারের রিচ্যুয়ালের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া মেয়ে দুটোও নিয়ম করে চার্চে যেতো। সময় সুযোগে বাইবেল পাঠ করতো। ক্রিসমাস সহ নানান উৎসবে উৎসবের রঙে ভরে উঠতো তাদের মন।

কিন্তু একদিন।

বড় মেয়েটা হঠাৎ করে চার্চে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। সে নাকী কি এক সত্যের সন্ধান পেয়েছে। এই সত্যে নাকী ত্রিত্ববাদের স্থান নেই।
সে বলতে লাগলো- যিশু ইশ্বর নয়, ইশ্বরের পুত্রও নয়। সে মানুষ। প্রফেট। মাদার মেরি ইশ্বরের স্ত্রী নয়। তিনি একজন পবিত্র মা। একটি বিশুদ্ধ আত্মা।
সে আরো বলতে লাগলো,- 'ইশ্বর কেবল একজনই।'

কী ভয়ঙ্কর কথা। চার্চে বড় হওয়া একটি মেয়ে বলছে যিশু ইশ্বর নয়। মাদার মেরি ইশ্বর নয়। ট্রিনিটি সত্য নয় !!!!

মেয়েটাকে বোঝানো হয়। যারা বুঝাতে আসে, মেয়েটা তাদের পাল্টা বুঝানো শুরু করে। সবার কপালে চিন্তার রেখা। কী এক ভূত চেপেছে মেয়ের মাথায়!

বড় বোনকে দেখাদেখি ছোট বোনটাও বিগড়ে বসলো। বিগড়ানো বলছি এজন্যই, তাদের পরিবার, পরিবেশ আর সমাজের চোখে তারা ততক্ষণে বিগড়ে গেছে।

দুই বোন। একটি রক্ষণশীল খ্রিষ্টান পরিবার থেকে উঠে এসে বরণ করে এক মহা সত্যকে। এই সত্যের নাম- ইসলাম।

তাদের জন্য রাস্তাটা খুব সহজ ছিলো না। কীভাবে তারা সাহস করেছে সমাজের বিপক্ষে গিয়ে, বাবা মা'র বিপক্ষে গিয়ে অন্য একটি ধর্মকে গ্রহণ করতে?

আমি পড়ছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আমার শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছে কোন থ্রিলার পড়ছি যার পরতে পরতে সংগ্রাম। বিশ্বাসের সংগ্রাম। সত্যের জন্য সংগ্রাম।
যখন লেখিকা তার সিজদাহ দেওয়ার বর্ণনা দিচ্ছিলো, আমি বুঝতে পারছিলাম আমার চোখের কোণা ভারি হয়ে উঠেছে। আমার মনের মধ্যে উথালপাতাল হতে লাগলো। কী হচ্ছে? এতো বিশ্বাস! এতো মমতা! এতো প্রেম! আলহামদুলিল্লাহ্‌!

আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম লেখিকার সিজদাহ আর আমার সিজদাহ'র মধ্যকার পার্থক্য।
আমার সিজদাহগুলো অনেকটাই দায়মুক্তির, তার সিজদাহগুলো বিশ্বাসের, ভালোবাসার, আনুগত্যের, প্রেমের। কী এক ঈমান!! সুবাহানআল্লাহ!

কতো দীর্ঘ সময় লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের দ্বীন পালন করতে হয়েছে। দ্বীনকে বুঝার জন্য, জানার জন্য, মানার জন্য তারা কতো কষ্টই না করেছে। আর আমি? আপসোস...!

পুরো বইটা জুড়েই আছে দু'বোনের খ্রিষ্টান ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে আসার গল্প।
মুসলিম বাবার খ্রিষ্টান হওয়া, আবার তার মেয়েদের ইসলামে দাখিল হওয়া- এটাকে আমি এ্যাডভেঞ্চার না বলে কী বলবো?

সেবার বইটা পুরো শেষ করতে পারিনি। এই বইটা শেষ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। এই বইটা পড়তে নিলেই অনুশোচনায় ভুগি। হায়! চারপাশে এরকম কতো বুভুক্ষু, তৃষ্ণাতুর হৃদয় আছে সত্যকে গ্রহণ করার জন্য। দরকার কেবল একটু দাওয়া'র। আমি কি করছি?

লেখিকা দু'বোন। বড় বোন সিহিন্থা শরীফা। ছোটবোন নাইলা আমাতুল্লাহ।
বইটি প্রথম প্রকাশ করেছিলো 'সরোবর প্রকাশন'।
মাঝখানে বইটি ছাপানো বন্ধ ছিলো। বইটি নতুন করে আবার মার্কেটে নিয়ে এসেছে 'সমকালীন প্রকাশন'।
বইয়ের কাভারটা আমার খুব পছন্দের। ফন্ট, পেইজ কোয়ালিটি ইত্যাদির ব্যাপারে আমার নলেজ শূন্যের কোঠায়। এই ইস্যুগুলো বোদ্ধা পাঠকদের জন্য তোলা থাক।

#সংগৃহীত