পাঠকের ভালোবাসা

বইয়ের নাম : আমাদের সোনালি অতীত
মূল বই : কিসাসুল আরিফি
লেখক : আব্দুর রহমান আরিফী
অনুবাদক : আব্দুন নূর সিরাজী
সম্পাদক : সালমান মোহাম্মদ
প্রকাশনী : মোহাম্মদ পাবলিকেশন
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৫৩
মুদ্রিত মূল্য : ২২০ টাকা
.
মানুষ হিসেবে আমরা গল্পপ্রিয়। গল্প পড়তে ভালোবাসি। কিন্তু পড়ার সময় খেয়াল করিনা যে গল্প আমি পড়লাম তার থেকে কি বুঝলাম বা শিক্ষনীয় কি। কিন্তু এর বিপরীতে আমরা যদি আমাদের সোনালী যুগের ঘটনাগুলো গল্পের মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে পড়তে পারতাম তাহলে কতইনা উত্তম হতো?
কেননা এগুলোতে অনর্থক কিচ্ছা-কাহিনী ও অশ্লীলতা থাকে না। সেই সাথে এসব গল্প পড়লে ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান সম্পর্কে জানা যায়। এবং সাহিত্যের প্রকৃত স্বাদও আস্বাদন করা যায়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রখ্যাত লেখক আব্দুর রহমান আরেফি লিখেছেন এক অনন্য কিতাব। যার নাম "কিসাসুল আরিফি"। বিজ্ঞ অনুবাদক আবদুন নূর সিরাজী কতৃক বাংলায় অনুবাদের পর নাম দেয়া হয়েছে "আমাদের সোনালি অতীত"। এটি এমন একটি বই যার নামের মধ্যেই সুপ্ত আগ্রহবোধ লুকিয়ে রয়েছে।
.
▶ লেখক পরিচিতিঃ-
ড. মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী। তিনি একাধারে একজন বর্তমান একজন বিশিষ্ট আলেম, সুবক্তা ও লেখক। আব্দুর রহমান আরিফী জীবনের মূল কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন ‘দাওয়াত ইলাল্লাহ’কে। এই লক্ষে তিনি সৌদি আরব সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা করে থাকেন। পাশাপাশি তিনি রাজধানী রিয়াদের বাদশা সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং আল-বাওয়ারদী জামে মসজিদের খতীব । তার লিখিত বইয়ের সংখ্যা ২৫ এরও অধিক। বাংলায় অনূদিত তার কিছু বইয়ের মধ্যে অন্যতম হলো জীবন উপভোগ করুন, ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে, মহাপ্রলয়, পরকাল, জীবনের সফর, আপনি কি জব খুজছেন ইত্যাদি।
.
▶ সার-সংক্ষেপঃ-
বইটির ১৫৭ পৃষ্টাজুড়ে রয়েছে সোনালি অতীতের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদযুক্ত ৫৩ টি শিরোনামের গল্প। তার সাথে প্রত্যেকটা গল্পের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্লট এবং কাহিনীচিত্র । যার মধ্যে কিছু গল্পের কথা যেন আলাদা করে বলতেই হয়। কারণ প্রতিটি গল্প নিয়ে লিখতে গেলে রিভিউ অনেক বড় হয়ে যাবে। তাই এখানে আমি কয়েকটি গল্প সম্পর্কে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ-

বইয়ের প্রথম গল্প "রাসূলের প্রতি জমিনের ভালোবাসা" শিরোনামে উঠে এসেছে খ্রিস্টান থেকে ইসলাম গ্রহণকারী এক ব্যক্তির গল্প। সে একসময় রাসূল (স:) এর ওহী লেখকের দায়িত্ব পালন করতো। পরবর্তীতে সে আবার খ্রিস্টান হয়ে রাসূল (স:) এর নামে বিভিন্ন অপবাদ দিতে শুরু করে। এর ফলে রাসূল (স:) তাকে বদ দোয়া করেন। এতে সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পর বার বার কবর দেয়া হলেও জমিন তাকে বাইরে ফেলে দিত।

দ্বিতীয় গল্পের নাম "বনু নজিরের গাদ্দারি"। এখানে ফুটে উঠেছে ইহুদি গোত্র বনু নজিরের গাদ্দারি ও ষড়যন্ত্রের কথা। তাদের এই গাদ্দারির কারনে একপর্যায়ে তাদের অবরোধ করে রাখা হয় এবং মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়।

"আবু হোরায়রার মা" গল্প পড়ে বোঝা যাবে রাসূল (স:) এর দোয়ার ফলে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা (রা:) এর মায়ের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা।

আকিদা যে শুধুমাত্র মুখে আওড়ানো বা লিখে হেফাজত করার মত জিনিস নয় বরং বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এ কথাই বুঝানো হয়েছে "সুন্দর চরিত্র" গল্পে।

রাসূল (সা:) এর নিকট যখন প্রথম ওহী অবতরণ হয় তখন তিনি খুব ভীত হয়ে পড়েন। এরপর খাদিজা (রা:) তাকে নিয়ে ওয়ারাকা বিন নওফেল এর কাছে জান। ওয়ারাকা বিন নওফেল তাকে সর্বশেষ নবী হওয়ার সুসংবাদ দেন। এসবকিছু জানা যাবে "উম্মুল মোমেনিন খাদিজার গল্প শিরোনামে।

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল (সা:) এর জন্য মাত্র একটি বকরির গোশত ও সামান্য রুটি তৈরি করে খাবারের আয়োজন করলেন। সেইটুকু খাবারে রাসূল (সা:) এর দোয়ার বরকতে এক হাজার পরিখা খননকারী সাহাবী তৃপ্তি সহকারে খেলেন। এমন তথ্যই জানতে পারবেন "এত খাবার" গল্পে।

"পূর্বসূরিদের রমজান" শিরোনামে বর্ণিত হয়েছে অন্তরে গেথে যাওয়ার মত কিছু তথ্য । এটা পড়ে পাঠক বুঝতে পারবেন পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি কি পরিমাণ যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন।

হযরত হাবিব বিন জায়েদ (রা:)। যাকে রাসূল (স:) ভন্ডনবী মুসায়লামাতুল কাজ্জাব এর নিকট চিঠি দিতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ভন্ডনবী মুসায়লামা তাকে বন্দি করে। শত নির্যাতন করে একসময় হাবিব বিন জায়েদ (রা:) তাকে হত্যা করলেও মুসায়লামা তার কাছ থেকে নিজের স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি। এমন তথ্যই জানা যাবে "মুসায়লামাতুল কাজ্জাব" গল্পে।

বইয়ের সর্বশেষ গল্প "কা'নাবির তাওবা" । এখানে উঠে এসেছে বিশিষ্ট ইমাম ও মুহাদ্দিস কা'নাবি (রহ:) এর ঘটনা। একসময় যিনি মদ, গল্পগুজব সহ বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত ছিলেন। একসময় তিনি মালেক বিন আনাসের সান্নিধ্যে এসে তার কাছ থেকে হাদিস হিফজ শুরু করেন এবং একজন বড় আলেম হিসেবে গণ্য হন।

এছাড়া বইতে আরো রয়েছে চিরস্থায়ী সৌভাগ্য, রোগের শিফা, বিনোদন ছাড়ুন, এত দুধ, নীরব নিবেদক, হায় মিসকিন! ইত্যাদি সহ অসাধারন শিরোনামের সব গল্প।

▶ বইয়ের যা কিছু ভালো লেগেছেঃ-
- আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ।
- সাবলীল ও বোধগম্য অনুবাদ।
- সহজ, সরল ও উপযোগী শব্দচয়ন।
- উপযুক্ত শব্দে গল্পগুলোর নামকরণ করা।
.
▶ বইয়ের গুণগত মানঃ-
বইটি অনেক যত্ন সহকারে সাজানো হয়েছে। প্রচ্ছদটা ভীষণ সুন্দর। পেজের কোয়ালিটি থেকে শুরু করে বাইন্ডিং সব কিছুতেই সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বইতে বুক মার্কের জন্য ফিতারও ব্যবহার রয়েছে। আপনি চাইলেই যে যায়গায় পড়া বন্ধ করেছিলেন সেখান থেকে বুকমার্কের সাহায্যে আবার পড়া শুরু করতে পারবেন।
দক্ষ লেখক ও অনুবাদকের কলমের ছোয়ায় বইটি হয়েছে সহজ, সাবলীল ও প্রাণবন্ত। ভাষাশৈলী ও উপযুক্ত শব্দচয়ন বইটিকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। অধিকাংশ ঘটনাই গল্প আকারে ছোট পরিসরের মধ্যে শেষ করা হয়েছে। যার কারনে গল্পগুলো পড়তে গিয়ে কখনো ক্লান্তি আসবে না।
.
▶ ব্যক্তিগত অনূভুতিঃ-
ব্যক্তিগত অনূভুতি যদি বলতে হয় তাহলে বলবো বইটি এককথায় অসাধারন। দামের দিক থেকেও সাশ্রয়ী। প্রতিটি পাতায় রয়েছে লেখকের কঠোর পরিশ্রমের ছোয়া। বই এর বিষয়সমূহের ধারা বর্ণনা ও ভাষাশৈলী দেখে মনে হয় না এটা কোন অনুবাদ গ্রন্থ। বরং একজন দক্ষ সাহিত্যিকের লেখা বলেই মনে হয়েছে । সুখপাঠ্য গদ্য ও অভিনব উপস্থাপন কৌশল পাঠককে আকৃষ্ট করে রাখবে বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
সবগুলো গল্প মন ছুঁয়ে যাওয়ার মত এবং শান্তির সঞ্চারক। প্রত্যেকটি গল্পই আলাদা বৈশিষ্ট্য ও ভিন্ন মাত্রার স্বাদে ভরপুর। এসব গল্পে ছোটগল্পের মত কোন শেষে কোন টুইস্ট নেই।কিন্তু প্রতিটি গল্পেই রয়েছে শিক্ষণীয় উপাদান।
বইটি পড়ে আপনি সোনালী অতীতের বেশকিছু ঘটনা গল্পের মাধ্যমে পারবেন। যা আপনাকে আরো গভীরভাবে ইসলামের প্রতি আনুগত্য করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। কিছু কিছু বিষয় নতুনভাবে উপলদ্ধি করতে শেখাবে। অন্তরে এনে দেবে অনাবিল প্রশান্তি।
সব মিলিয়ে বইটি খুবই ভালো এবং উপকারী। তাই বাংলাভাষী সকলের প্রতি অনুরোধ " আমাদের সোনালী অতীত" বইটি একবার হলেও পড়ুন সেই সাথে নিজের প্রিয় মানুষটিকেও পড়তে দিন। সোনালি অতীতের সেসব কল্যাণময় গল্প থেকে বাস্তব জীবনে শিক্ষাগ্রহণ করুন। ছোট বাচ্চাদের মানহীন ও রুপকথার সব অসত্য গল্প না শুনিয়ে এসব গল্প শোনানোর চেষ্টা করুন। এতে ছোট অবস্থাতেই তার নৈতিকতা ভিত্তি মজবুত হবে। দেখবেন দুনিয়ার জীবনে আপনিই হবেন সবচেয়ে সুন্দর ও সুখময় জীবনের অধিকারী, ইনশাআল্লাহ।
.
▶ সমালোচনাঃ-
একটি বই প্রকাশের পিছনে লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকের অসংখ্য রাত জাগার ইতিহাস থাকে, বইটিকে নির্ভুল করার জন্য। বইটিকে পঠনোপযোগী করতে প্রকাশনী যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। আল্লাহ তাদের খেদমত কবুল করুক। প্রথম সংস্করণ হিসেবে বানান বিভ্রাট বা মুদ্রণত্রুটি খুব বেশি চোখে পড়েনি। এদিক থেকে প্রকাশনী প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তারপরও কিছু ভুলভ্রান্তি থেকেই যায়। যা অনিচ্ছাকৃত। যেমন -

(১) বইতে লেখকের কোন পরিচয় দেয়া নেই। হয়তো লেখক একজন বিখ্যাত ব্যক্তি এজন্যই তার পরিচিতি দেয়া হয়নি। কিন্তু এমনও অনেক পাঠক আছে যারা লেখকের বই নতুন পড়ছে তাদের জানার জন্য হলেও লেখক পরিচিতি দেয়া উচিত।

(২) বইতে পৃষ্ঠাসজ্জা যেভাবে করা হয়েছে তাতে প্রতিটি গল্প শুরু করতেই অর্ধ পৃষ্ঠা ব্যয় করা হয়েছে। যা আমার কাছে ভালো লাগেনি।

(৩) প্রায় গল্পেই উপযুক্ত রেফারেন্স সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বেশকিছু গল্পে রেফারেন্স দেয়া নেই। এতে বইটির ব্যালেন্স নষ্ট হয়েছে বলে মনে হয়।

(৪) এত সুন্দর প্রচ্ছদ। অথচ বইয়ের কোথাও সেই প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম নেই।
.
▶ শেষ কথাঃ-
সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে-কেরামের উপর। বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী গল্পের আলোকে এত সুন্দর একটি বই পাঠকের হাতে পৌছে দেয়ার জন্য লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক, সম্পাদক সহ বইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। সেই সাথে দোয়া করি আল্লাহ যেন এই বইয়ের মাধ্যমে পাঠকসমাজকে সর্বাধিক উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করেন।

রিভিউটি লিখেছেন আব্দুর রহমান ভাই।