নারীর সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য পরপুরুষের সামনে প্রকাশ না করাটা কুরআনের সুস্পষ্ট বিধান।

এ বিষয়ে সকল ইমাম ও আলেমরা একমত যে, সাজসজ্জা এমনকি সামান্য ক্রিম, কাজলও যদি থাকে চেহারায়, তবে নারীর চেহারা ঢেকে রাখা ফরজ অথবা ওয়াজিব। বর্তমান যুগে কয়জন মেয়ে পাওয়া যাবে যে একদমই মুখে কিছু লাগায় না! যে মেয়ে মুখে প্রসাধনী ব্যবহার করে হিজাব পরে, অথবা সে ধরনের ছবি ফেসবুক প্রোফাইলে রেখেছে, সে ফরজ ওয়াজিব বিধান ছেড়ে দেয়ার মতো গোনাহে দিনরাত চব্বিশঘন্টা লিপ্ত আছে।

সাজসজ্জাবিহীন-মেকআপবিহীন মুখ ও হাত ব্যতীত মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর আবৃত করা নারীর জন্য ফরজ এ বিষয়ে সকল ইমাম, আলেম ও মুসলিম উম্মাহ একমত।

আর সাজসজ্জাবিহীন-মেকআপবিহীন চেহারা ও হাত খোলা রাখা প্রসঙ্গে যে মত তা এই জন্য যে, তারা কুরআনের আয়াতে ‘সাধারণভাবে প্রকাশমান’ বলতে চেহারা ও হাত বুঝেছেন এবং কিছু হাদিসের আলোকে এ মত গ্রহণ করেছেন যে, মুসলিম নারী চাইলে চেহারা ও হাত অনাবৃত রাখতে পারবে, তবে তা ঢেকে রাখা উত্তম।

আর দ্বিতীয় দলটি ‘সাধারণভাবে প্রকাশমান’ বলতে নারীর পরনের পোশাক বুঝেছেন। অধিকাংশ আলেমের বক্তব্য এটিই। তারা বলেন, এখানে সাধারণভাবে প্রকাশমান বলতে যা আবৃত করা সম্ভব নয় তা বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদ বা চক্ষুদ্বয়, যা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। যেহেতু মুখ আবৃত করা সম্ভব কাজেই তাকে সাধারণভাবে প্রকাশমান থাকে বলে গণ্য করা যায় না। মুখ অনাবৃত করার অর্থ যা প্রকাশ না করেও চলে তাকে প্রকাশ করা, অথচ আল্লাহ আবৃত করার মতো সৌন্দর্য আবৃত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তা ছাড়া যেহেতু নারীর অলংকার, সাজসজ্জাও পর্দার অন্তর্ভুক্ত, তাই মুখও পর্দার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। মাথার চুল গলা ও বুক আবৃত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ফেতনা রোধের জন্য আর এদিক থেকে মাথার চুল গলা ও বুক আবৃত করার চেয়ে মুখ আবৃত করার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। কারণ মুখের মাধ্যমেই সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়। মুখের সৌন্দর্য মানুষকে বেশি আকর্ষিত করে।

তা ছাড়া আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
‘তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে।’

এখানে মুমিন নারীদেরকে পায়ের অলংকার ইত্যাদির অবস্থান জানানোর জন্য সজোরে পা ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে। একজন বুদ্ধিমান মানুষ সহজেই বুঝতে পারেন যে, পায়ের অলংকার বা পায়ের চেয়ে মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য অনেক বেশি আকর্ষণীয়। নূপুরের শব্দ শোনার চেয়ে মুখের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা বেশি ফেতনার কারণ। তাহলে আল্লাহ পা আবৃত করতে ও পায়ের অলংকারের শব্দ করতে নিষেধ করবেন অথচ মুখমণ্ডল আবৃত করতে নির্দেশ দেবেন না তা কি হয়!

সকলেই জানেন নারী সুন্দর কিনা তা দেখার প্রথম মাপকাঠি তার মুখ। পঞ্চম হিজরির প্রসিদ্ধ হানাফি ফকিহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আবু বকর সারাখসি রহ. নিজে যদিও ভিন্ন মত পোষণ করতেন কিন্তু তিনি বলেন, এটিই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মত। তাই আমাদের মতো সাধারণ নারীদের জন্য মুখ ও হাত আবৃত করার মতকে ফরজ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তার কারণ, মুখ আবৃত করলে সকলের মতেই সওয়াব হবে আর মুখ অনাবৃত করলে দ্বিতীয় মত অনুসারে গোনাহ হবে। অবশ্য একান্ত প্রয়োজন হলে মুখ খোলার অনুমতি সকলেই দিয়েছেন। আর ফেতনা বা সামাজিক অনাচারের ভয় থাকলে সবার মতেই মুখ ঢেকে রাখা ফরজ। বর্তমান যুগ ফেতনা আর অনাচারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে।

মুখ আবৃত করা ফরজ এ ব্যাপারে হাদিসের যেসব দলিল আছে আমরা তা বিস্তারিত আলোচনা না করে কিছু হাদিস পড়ব, যাতে বোঝা সহজ হয়ে যাবে কেন অধিকাংশ আলেম বলেছেন মুখ আবৃত করাও ফরযের অন্তর্ভুক্ত। বুখারি শরিফের হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নারী আওরাত বা আবৃত করার মতো গোপন অঙ্গ। কাজেই সে যখন বের হয় তখন শয়তান তাকে অভ্যর্থনা জানায়।’ এ হাদিসে নারীকে অর্থাৎ নারীর পুরো শরীরকে ‘আওরাত’ তথা আবৃতব্য বলা হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে নারীর মুখসহ পুরো দেহই আবৃতব্য।

বুখারি শরিফের আরেক হাদিসে হজের পোশাকের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইহরাম অবস্থায় মহিলারা নেকাব বা মুখাবরণ ব্যবহার করবে না এবং হাতমোজা পরিধান করবে না।’ এ থেকে বোঝা যায়, নেকাব ও হাতমোজা পরিধানের প্রচলন ছিল। আরব মহিলারা নেকাব ও হাতমোজা করতেন এজন্যই আল্লাহর রাসুল ইহরাম অবস্থায় এগুলো ব্যবহার করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছেন।

আরেক হাদিসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন,
‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য কিছু মহিলা চাদর পরিহিত অবস্থায় পরিপূর্ণ পর্দা করে মসজিদে আসতেন। নামাজ শেষে আপন আপন গৃহে ফেরার পথে তাদেরকে চেনা যেত না।’

সুতরাং আমাদের উচিত সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা এবং চিরস্থায়ী সৌন্দর্য লাভের জন্য নিজেকে পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে গোপন রাখা। আর যারা মুখ পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয় বলে মুখ প্রদর্শন করেন তারা যখন মুখে প্রসাধনী ব্যবহার করেন তখন মুখ পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে গোপন করা সকলের মতেই ফরজ হয়ে যায়। নারীর সাজসজ্জা, উঁচু করে বাঁধা রংবেরঙের হিজাব, লিপস্টিক, আইশ্যাডো, চুলের খোঁপাসহ সবকিছুই সর্বসম্মতিক্রমে পরপুরুষের জন্য হারাম। যারা হিজাব পরে অথচ সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়ায় একদিকে তারা কুরআনের বিধান অমান্য করে গুনাহগার হচ্ছে। আবার হিজাব পরে চেহারায় সাজসজ্জা করা শুধু পর্দারই খেলাফ নয়, বরং এভাবে ইসলামের ভুল পরিচয়ও প্রদর্শন করা হচ্ছে!

চেহারা উন্মুক্ত রাখা যে কত বড় ফেতনা তা বর্তমান সময়ের ফ্যাশন আইকন ইসলামিস্টদের দেখলেই বোঝা যায়। সাধারণ মেয়েরা হিজাব পরছে ঠিকই, কিন্তু এসব ফ্যাশন আইকনদের অনুকরণ করতে গিয়ে ভয়ংকর সব গুনাহে লিপ্ত হচ্ছে। কিছুদিন পরপর মুখোশধারী ইসলামিস্টদের ফ্যাশন চেঞ্জ হয়। কখনো টাইট আবায়া, কখনো পাথরখচিত রংবেরঙের আবায়া, কখনো চুলের খোঁপা উঁচু করে বিভিন্ন কায়দায় হিজাব পরা, কখনো বা অন্য কিছু। একটা বিষয়ের দিকে লক্ষ করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে পর্দা কেমন হওয়া উচিত। পর্দার আসল উদ্দেশ্যই হলো সৌন্দর্য গোপন করা। ফেতনা থেকে বাঁচা। এখন কেউ যদি বিভিন্ন ডিজাইনের আবায়া পরে তবে সেটা কি সৌন্দর্য গোপন করা হলো? এ যেন সুন্দর জিনিস ঢাকতে আরও সুন্দর, আরও আকর্ষণীয় আবরণ তার ওপর চড়িয়ে দেওয়া হলো। আমরা নিজেকে ঢাকতে পর্দা করি না যে, যে কোনোকিছু দিয়ে ঢাকলেই হয়ে যাবে। বরং আমরা আমাদের সৌন্দর্য আড়াল করতে পর্দা করি। সুতরাং সাধারণ বিবেকের চাহিদা এটাই যে, আকর্ষণ করে না এমন কাপড় দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখব। এবং আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যে চেহারা, তাও ঢেকে রাখব।

চলমান শতাব্দীতে ইসলামের নামে পর্দার সবচেয়ে বড় বিকৃতি ঘটল যখন চুলের খোঁপা উঁচু করে হিজাব পরা মুসলিম মেয়েদের মধ্যে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ল এ সম্পর্কে মুসলিম শরিফের হাদিসে বলা হয়েছে—
‘ওই সমস্ত মহিলা, যারা বস্ত্র পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ, আকর্ষণকারিণী ও আকৃষ্টা। যাদের মাথার খোঁপা বুখতি উটের উঁচু কুঁজের ন্যায়, তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে।’

একটা ব্যাপার খুব গভীরভাবে লক্ষ করলে সঠিক পর্দা করার ক্ষেত্রে কোনো গড়িমসি করব না আমরা। আর তা হলো আমরা কেন পর্দা করছি তা চিন্তা করা। নিশ্চয়ই মানুষের জন্য নয়, মানুষ আমাকে পর্দানশীন বলবে এজন্য নয়, আমার ঘরের সবাই করছে তাই আমি করছি এজন্যও নয়, আমাকে আরও সুন্দর দেখাবে এজন্য নয়, এ যে বরবাদ হওয়ার মতো কথা! বরং আল্লাহর বিধান বলেই করছি। নারীর জন্য দ্বীনের আইন বলে করছি, অন্তহীন সুবিশাল জগতের বিউটি কুইন হতে চাই বলে করছি, ভয়ংকর জাহান্নামে যেতে চাই না বলে করছি। আর তাই যদি হয়, যদি আমার পর্দা আল্লাহকে খুশি করার জন্য হয় তবে কেন আঁটসাঁট কারুকার্যময় আবায়া পরে অথবা মুখে প্রসাধনী লাগিয়ে নামকাওয়াস্তে হিজাব পরে পর্দার এমন বিকৃতি ঘটাব যে, উল্টো আল্লাহ নারাজ হয়ে যাবেন! সত্তর-আশির দশকে কলেজ-ভার্সিটির মেয়েরা এত হিজাব পরতো না, এখন যখন আমরা পরছি, আল্লাহর পথে একটা পা বাড়িয়েছি তখন পুরোপুরিভাবে কেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করব না! কেন আমি ঢিলেঢালা পোশাক পরে নিজেকে ঢেকে রাখব না, যেন কুরআনে বর্ণিত মুমিন নারীর পরিচয় আমার মধ্যে সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায়। যিনি দেওয়ার মালিক তিনি নিশ্চয়ই এ জগৎ এবং অন্তহীন জগতের সকল নেয়ামত আমাকে দিয়ে ধন্য করবেন। ইনশাআল্লাহ।

বিস্তারিত : ইলাল উখতিল মুসলিমা