.
"বাইতুল্লাহর মুসাফির"
------লেখকঃ আবু তাহের মিছবাহ্ ।
▬▬▬❀❀▬❀❀▬❀❀▬❀❀▬▬▬
.
কিছু বই শুধু পড়ার জন্যই পড়া, কিছু বই আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে, কিছু আবার জ্ঞানের পরিধিকে সমৃদ্ধ করার জন্যে । কিন্তু "বাইতুল্লাহর মুসাফির" -- এই বইটাকে আমি ঠিক কোন্ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করবো বুঝে উঠতে পারি না । একজন লেখকের ভ্রমনের বিবরণ কতটা জীবন্ত আর হৃদয়গ্রাহী হতে পারে “বাইতুল্লাহর মুসাফির” না পড়লে হয়তো বুঝতেই পারতাম না । বইটি লিখেছেন-- ইসলামী বাংলা সাহিত্যের একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব-- "মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ্" । যার সাহিত্য কথা মানুষকে তার রবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় । কঠিন ও পাষান হৃদয়গুলিকে গলিয়ে দেয়, তাঁর দরদমাখা কথাগুলো ।
-
আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে ১৪০৩ হিজরীর কয়েকটি সফরের জীবন্ত বর্ননা উঠে এসেছে এই বইটিতে । বইটি নিছক কোনো সফরনামা ছিলো না, ছিলো আল্লাহর ঘরে আল্লাহর এক প্রেমিক বান্দার জীবন্ত সফর,জীবন্ত হজ্ব এবং যিয়ারত । যা ভাবিয়েছে, কাঁদিয়েছে আর কল্পনার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে দিয়েছে । লেখকের কলম কালি ঝড়িয়েছে বইয়ের পাতায়-পাতায় আর দাগ কেটেছে আমার মতো পাঠকদের অন্তরের অলিতে-গলিতে । মৃত হৃদয়েও জাগিয়ে তুলেছে প্রানের স্পন্দন । বহু বছরের শুকনো চোখকেও করেছে অশ্রুসিক্ত ।
একজন লেখকের শব্দ-ভান্ডার এবং তথ্য-ভান্ডার হতে হয় সমৃদ্ধ এবং সৌন্দর্যমন্ডিত । লেখক এ ক্ষেত্রে পূর্ন পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন । সফরের আবেগঘন মূহুর্তগুলোকে শব্দ আর বাক্যের অলংকারে মুড়িয়ে দিয়ে পাঠক হৃদয়ে ঝড় বইয়ে দিয়েছেন । চোখকে করেছেন অশ্রুসজল । অন্তরকে দিয়েছেন সজীবতা ।
নিঃসন্দেহে এই বইয়ের সাহিত্যমান উঁচু স্তরের । ইসলামি অঙ্গনে সাহিত্যমানের যে দুর্বলতা ছিল তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে এই বই । বাংলা সাহিত্যের বিচারে বইটি একটি অনন্য সংযোজন । ভিন্ন ধারার বেশ কয়েকজন লেখক এই বইয়ের প্রশংসা করে বলেছেনঃ--- "সফরনামা বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের একটি শূন্যতা পূরন করতে সক্ষম হয়েছে বইটি" । আলহামদুলিল্লাহ্, এই শূন্যতা পূর্ন হয়েছে কিনা আমাদের ইসলামী অঙ্গনের একজন আলিমের কলম দ্বারা ! ভাবতেই ভালো লাগে ! বইটির পাতায় পাতায় লেখক সাহিত্যের যে মায়াজাল বুনে গিয়েছেন তা সাহিত্যপ্রেমী যেকোনো পাঠককে এক প্রশান্তিময় সুখ দান করবে ।
---
প্রথমে মাসিক আল কাউসারে এই সফরনামাটি ২৪ টি কিস্তিতে প্রকাশিত হয় এবং পরে পাঠকদের জনপ্রিয়তার স্রোতে দুই মলাটের মাঝে একত্রিত হয়ে গ্রন্থরূপ ধারন করে । মক্কা,মদিনা ছাড়াও বইটিতে
পাকিস্তান,আবুধাবি, ইরাক সফরের কথাও এসেছে । লেখা হয়েছে রক্তভেজা ও অশ্রুঝরা কারবালার কাহিনীও । আরো আছে সমকালীন ইসলামী ইতিহাস ও ইরাক-ইরান যুদ্ধের অজানা সব রহস্য । একটি সফরনামার যেসব বৈশিষ্ট্য এবং সৌন্দর্য থাকা দরকার, তার সবগুলোই এই বইয়ে রয়েছে ।দ্বীনে আসার পর থেকে এর চেয়ে ভালো ইসলামি সাহিত্যমান সম্পন্ন বই আমি আর একটাও পড়িনি ।
-
লেখক তার সমস্ত ভাব ও আবেগের উচ্ছ্বাস দিয়ে বইটি লিখেছেন । প্রথমেই বলেছিলাম, বইয়ের প্রতিটা বর্ননাই জীবন্ত । পড়ার সময় মনে হবে, সব ঘটনাগুলো নিজের চোখের সামনে ঘটছে । অজান্তেই ভিজে উঠবে চোখ । বইয়ের প্রতিটি পাতায় রয়েছে প্রচুর শিক্ষনীয় বিষয় । এ বইতে ফুটে উঠেছে "আদবিয়্যাত" ও "রূহানিয়্যাতের" অপূর্ব সম্মিলন । বইটি পড়ে একদিকে যেমন লেখকের সাহিত্য সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবেন ঠিক তেমনি, অন্যদিকে হৃদয়ের গভীরে ভাবের তরঙ্গে আন্দোলিত হবেন । সফরনামার গ্রন্থসমগ্রে তথ্য ও ইতিহাসের চেয়ে জীবন গঠনের উপাদান ও দিকনির্দেশনাই বেশি পাওয়া যায় । সচেতন পাঠক তা থেকে সমষ্টিগত জীবনের নিয়মনীতি, চিন্তার বিশুদ্ধতা,আত্নার পরিশুদ্ধি ও হৃদয়ের উত্তাপ গ্রহন করতে পারে । আর এসকল উপাদানের সবগুলো পাওয়া গেছে এই বইয়ের পাতায় পাতায় । যার কারনে পাঠক হৃদয়ে এই বই ও বইয়ের লেখক স্থান করে নিয়েছে মনের মণিকোঠায় ।
-
এবার সফরের শিক্ষনীয় ঘটনা ও অনুভূতির দিকগুলো নিয়ে কথা বলা যাক......
============================
.
❒ দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন যখন আল্লাহ্ পূরন করে দেন, তখন কৃতজ্ঞতায় পূর্ন সেই অনুভূতিগুলো কেমন হয় তা দেখেছি বইটির পাতায় পাতায় । লেখকের শৈশব থেকে লালিত স্বপ্ন-- বায়তুল্লাহ্-য় যাওয়ার ইচ্ছে পূরন হতে চলেছে অবশেষে । লেখক তখন ২৫ বছর বয়েসী একজন যুবক । সেটাই জীবনের প্রথম দীদারে বাইতুল্লাহ এবং জিয়ারতে মাদীনাহ । স্বপ্ন পূরনের সেই অনুভূতি গুলো ছিল একরাশ আবেগ আর ভালোবাসার সংমিশ্রনে লেখা । যার প্রভাবে আমার মনের গহীনেও "বাইতুল্লাহ্" নিয়ে স্বপ্নের ডানা মেলতে শুরু করেছে । কালো গিলাফে ঢাকা আল্লাহর ঘর আর সবুজ গম্বুজের নিচে নবিজীর রওজার সান্নিধ্যে যেতে মানুষের এতো-এতো আবেগ আর ভালোবাসা থাকতে পারে ,তা আমার ধারনায়ও ছিল না কখনো ।
-
❒ পশ্চিম আকাশে রামাযান মাসের চাঁদ উঁকি দিয়েছে । আর তিন দিন পরেই সেই বহুল প্রতিক্ষীত সফর । সফরের আগের রাতে বাড়ি ফেরার সময়ে লেখকের পথ আটকে ধরে পুলিশ । দেশে তখন চলছে সামরিক পরিস্থিতি । রাত পোহালেই সফর আর রাতে এই বিপদ ! অনাকাঙ্খিত বিপদ থেকে বেঁচে আসার ঘটনাটা পড়ার পর লেখকের সাথে সাথে আমিও যেন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে গিয়েছিলাম । পরদিন সকালে সফরের উদ্দেশ্যে বের হবার পর সেই পুলিশগুলোর সাথে লেখকের আবার দেখা হয় । তারপর কি ঘটেছিল ? থাক্, সেই চমৎকার ঘটনাটা না হয় বইয়ের পাতাতেই থাকুক !
-
❒ সকাল ৮ টা । বিমান ছুটছে । বিমান থরথর করে কাঁপছে । লেখক এই অংশে যে আবেগ দিয়ে লিখেছেন তাতে আমার ভাবনার জগতেও কাঁপুনি উঠিয়ে দিয়েছে । ইচ্ছে করছিল লেখকের সাথে আমিও আকাশে উড়াল দেই ।
-
❒ বিমান পৌছায় পাকিস্তানের মাটিতে । ১০ দিনের জন্য মাদ্রাসার কাজে লেখককে পাকিস্তানে কাটাতে হয় । সেই সফর গুলোতে ছিল মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের অপূর্ব সব গল্প । পাকিস্তানের পর ১০ দিনের জন্য এবার তাদের সফর আবুধাবিতে । আবুধাবির বিমানবন্দরে তাদেরকে নিতে আসার কথা ছিল একজনের । কিন্তু তিনি এলেন না । সেই লোকের ফোন নাম্বারটা পর্যন্ত ভুলে গেছেন । তারা এখন ঠিকানাহীন মুসাফিরের মত । কি করবে,কোথায় যাবে,কাকে ডাকবে কোনো উপায়ই খুঁজে পাচ্ছিল না । হঠাৎ একজনকে ডাকার কথা মনে পড়ে গেল । মানুষের ভীড় এড়িয়ে এক কোণে গিয়ে লেখক দু'রাকাত সালাত পড়লেন । সেই সালাতের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে লেখক তার পাঠকদেরকে হৃদয় গলানো এক বার্তা দিয়েছেন । বিপদে পড়লে কোথায় আশ্রয় চাইতে হয় সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ।
সেই বার্তাটুকু হুবহু উল্লেখ করছি----
.
✦ "আব্বাকে সারাজীবন দেখেছি , বিপদ এসেছে , সমস্যা প্রকট হয়েছে , আর তিনি জায়নামাযে দাঁড়িয়েছেন । বিপদ ও সমস্যা দূর হয়ে গেছে , কখনো স্বাভাবিকভাবে , কখনো অকল্পনীয়ভাবে ।
সারা জীবন দেখেছি , কিন্তু অনুসরন করতে শিখিনি । বিপদে পড়েই আমরা শুরু করি দৌড়ঝাপ , কিংবা হা-হুতাশ । হয়রানি ও পেরেশানি তাতে কমে না উল্টো বাড়ে । আব্বা বলতেন, যখন তোমার কোনো ঠিকানা থাকে না , নামাজকে বানাও তোমার ঠিকানা , যখন তোমার কোনো আশ্রয় থাকে না তখন নামাজের আশ্রয় ভুলে যেও না । নামাযের মাধ্যমে যাকে ডাকবে তিনি তোমাকে দেবেন নিশ্চিত আশ্রয় ও ঠিকানা" । ✦
লেখক ডাকলেন সেই মহান সত্ত্বাকে । অজানা,অচেনা এইদেশে তাদের দরকার এখন একটা আশ্রয় । এর পরেরটুকু শুনতে চান, কিভাবে এসেছিল সাহায্য ?
থাক্ । সেটুকুও বইয়ের পাতাতেই থাকুক । অবিভূত হয়ে যাবেন পরের ঘটনাটা পড়লে । কিভাবে মহান "রব" লেখককে সেই কঠিন সময়টাতে সাহায্য করেছিলেন । এ বই শুধু সফরনামাই না, যেন দুআ কবুলের এক উপাখ্যান ।
-
❒ এরপর জিদ্দার উদ্দেশ্যে যে বিমানে উঠলেন সেখানে কথা হয় ফিলিস্তীনি এক বৃদ্ধের সাথে । তার পরিবারের সাথে ইহুদী সন্ত্রাসীরা যে বর্বরতা চালিয়েছিল সে ঘটনাটা পড়ে চোখ ছলছল করে উঠবে যেকোনো পাঠকের ।
রিয়াদ বিমানবন্দরে বিমান অবতরনের সময় ঘটলো এক ভয়াবহ ঘটনা । ঘটনাটা পড়েছি আর হৃদকম্পন বেড়েই চলেছিল । বিমান বারবার আকাশে চক্কর দিচ্ছে কিন্তু অবতরন করছে না । বিমানের সামনের চাকা নামছে না । জরুরী অবতরনের ঘোষনা আসলো । যাত্রীদের মধ্যে কান্নার রোল পরে গেল, কেউ কেউ সিটবেল্ট খুলে পাগলের মতো আচরন করতে লাগলো । যেন কিয়ামতের এক ক্ষুদ্র নমুনার সাক্ষী আমিও হয়ে গেলাম !
-
❒ অবশেষে হিযাজের ভূমিতে পা রাখলেন লেখক । পাহাড়ের কোল ঘেঁষে,, কখনো মরুভূমির বুক চিড়ে বাইতুল্লাহর উদ্দেশ্যে বাস ছুটছে । পুরো বাসে ছিল "লাব্বাইক" ধ্বনি । কল্পনা করতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠছিলো আমার । লেখা গুলো পড়তে পড়তে নিজের
অজান্তেই আমারো মুখ থেকে কতবার বেরিয়ে গিয়েছিলো সেই মর্মস্পর্শী ধ্বনি ।
আলোর শহর মক্কা এসে গেছে । দূর থেকে দেখা গেল হারামের আলোকিত মিনার । লেখক এখানে যেভাবে লিখেছেন ইচ্ছে করছে সেই পৃষ্ঠা গুলোর ছবি তুলে পোস্ট করি । লেখকের সাথে সাথে আমারো সমগ্র সত্ত্বায় যেন এক অদ্ভুত শিহরন অনুভূত হচ্ছিলো ।
-
❒ দৃষ্টি অবনত রেখে হারামে প্রবেশ করলেন লেখক । শৈশব থেকে লালিত স্বপ্ন আজ পূর্ন হলো । লেখাগুলো যখন পড়েছি মনে হয়েছিল লেখকের সঙ্গে আমিও প্রবেশ করছি মসজিদুল হারামে । কল্পনার অপূর্ব জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম । পরবর্তী পৃষ্ঠা গুলোর লেখা পড়তে পড়তে আপনিও হয়তো কল্পনায় চলে যেতে পারেন কাবার প্রান্তরে ।
আল্লাহর ঘর প্রথম দেখার এবং পবিত্র ভূমির প্রতিটি স্থানের সান্নিধ্য লাভের আবেগ ও তৃপ্তি, হৃদয়ের শিহরন ও কম্পনের যে চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে, তাতে পাঠক হৃদয় আন্দোলিত না হয়ে পারেই না ।
-
❒ স্বপ্ন শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে গেল । মাদ্রাসার কাজে দেশে ফিরতে হবে তাদের । তাই এখন গন্তব্য নবীজির শহর মদীনাতে । সবুজ গম্বুজের সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য লেখকের লেখনীতে যে ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা ছিল দেখার মতো । যা দেখে আমিও সবুজ গম্বুজের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে গিয়েছিলাম ।
-
❒ মদীনার দিন-রাত্রি শেষ । এবার দেশে ফেরার পালা....
২৮ শে রামাযান ।
জিদ্দার উদ্দেশ্যে গাড়িতে চড়লেন তারা । পথিমধ্যে গাড়ির ইঞ্জিন গেল বিগড়ে । একবার না বেশ কয়েকবার । বিমান ছাড়বে রাত ৮ টায় । অথচ গাড়ি বিমানবন্দরে পৌছলো রাত ৯ টা বাজার কয়েক মিনিট আগে । এতক্ষনে বিমান হয়তো ডানা মেলেছে আকাশে । কিন্তু সত্যি কি তাই ? কি হয়েছিলো সেদিন ? জানতে হলে বইটা পড়তে হবে । ঘটনাটা ছিল বিষ্ময়কর, যা আপনাকে ভাবাবে !
-
❒ ১১২ পৃষ্ঠায় লেখক "মা" এর প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে পাঠকদের একটা চমৎকার মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করেছেন । যেটা সত্যিই পাঠকদের মনে দাগ কাটার মতো । সেই মেসেজটুকু লিখে দিচ্ছি নিচেঃ---
.
✦ "দুনিয়াতে সন্তানের জন্য মা হলেন আল্লাহর রহমতের 'আঁচল'। তুমি যত বড় হও, কিংবা যত ছোট; তুমি যত ভালো হও কিংবা যত মন্দ, মা শুধু জানেন তোমার মাথার উপর মমতার আঁচল ধরে রাখতে । দুর্ভাগা সন্তান অনেক সময় নিজের হাতে মাথার উপরের এই মমতার আঁচল ছিন্ন করে ফেলে । তারপরো মমতাময়ী মা সেই ছিন্ন আঁচলটুকু ধরে রাখেন সন্তানের মাথার উপর । প্রিয় পাঠক, তুমি যদি বিশ্বাস করো যে, আমি তোমার কল্যাণকামী তাহলে একটি উপদেশ শোনো, সারা জীবন মায়ের আঁচলের নীচে থাকার চেষ্টা করো । যতদিন তিনি বেঁচে আছেন চোখের পানি দিয়ে তাঁর পায়ের পাতা ভিজিয়ে রেখো, আর মৃত্যুর পর ভিজিয়ে রেখো তাঁর কবরের মাটি ! তাহলে আল্লাহ্ তোমাকে চিরকাল সিক্ত করে রাখবেন তাঁর করুণার শিশিরে" । ✦
-
❒ এরপর মাঝখানে ঘটে গেল বেদনাবিধুর অনেক ঘটনা । এরই মধ্যে হাফেজ্জী হুজুরের হজ্ব যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে । আফসোস আর অনুতাপের আগুনে লেখক যখন পুড়ে ছাড়-খার হয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তার ঘরে আবার মেহমান হয়ে যাওয়ার ডাক । মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় আল্লাহর ঘর থেকে ওমরা করে ফিরে আসা সেই মুসাফিরকে আল্লাহ্ সেবছরই দান করেন হজ্ব করার সূবর্ন সুযোগ । তবে এবার দাওয়াত এসেছে লিবিয়া দূতাবাস থেকে । হজ্বের উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত পর-পর যেসব ঘটনা গুলো ঘটলো তা আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে,কাঁদাবে । প্রতিটা কঠিন মুহূর্ত আল্লাহ্ কিভাবে সহজ করে দিয়েছিলেন-- তা ছিল দেখার মতো ।
এখান থেকে যেটা শিখেছি, সেটা হলো--- "আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার জন্য দরকার সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তরিকতা, ইচ্ছা আর ভালোবাসা" । আর সেটা থাকলে আল্লাহ্ পৌছে দিবেন তার ঘরের শীতল ছায়ায় ।
-
❒ অবশেষে লেখকের সৌভাগ্য হয় হাফেজ্জী হুজুরের সাথে হজ্ব করার । তাদের হজ্বের কাফেলার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন "হাফেজ্জী হুজুর" । তিনি ছিলেন সবার অনুকরনীয় । তাদের কাফেলার হজ্জ্ব যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল তারই জন্য । মুযদালিফায় রাত্রি যাপনের রাতটির কথা লেখক নিজের সেরাটা দিয়ে লিখেছেন । লেখকের লেখায় যেন নূর ঝড়ছিলো । উপরে তারা ভরা আকাশ এবং একটি প্রায় পূর্ন চাঁদ ; নীচে মুযদালিফার
মরুভূমির বালু । লক্ষ লক্ষ মানুষ খোলা আকাশের নিচে সেই বালুর শয্যায় । আমিও যেন কল্পনার জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম । কল্পনার জগতে নিজেকে আবিষ্কার করি সেই লক্ষ-লক্ষ মানুষের ভীড়ে !
-
❖ একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়ঃ--
```````````````````````````````````````````
যেই মানুষগুলো বুড়ো বয়সে একটা হজ্ব দিয়ে এসে ভালো হয়ে যাওয়ার আশা করে,তাদের অনেকেই শেষ বয়সে এসে তা আর পারে না । কিংবা অনেক হাজিকেই দেখবেন হজ্ব করে এসেছেন । বেশ ভূষায় পরিবর্তন এসেছে । কিন্তু হজ্বে যাওয়ার আগের যেই তিনি, সেই
তিনিই রয়ে গিয়েছেন । এখনো মাপে কম দেন, মিথ্যা বলেন, লেনদেনে কারচুপি করেন, অকথ্য ভাষায় গালাগালি দেন । ইত্যাদি,ইত্যাদি.......
প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ হজ্ব করতে যায় ঠিকই কিন্তূ নিছক আহকাম ও মাসায়েলের দিক থেকে খুব কম মানুষের হজ্ব সহীহ-শুদ্ধ হয় । লেখক এ কারনে একটি গুরুত্বপূর্ন মেসেজ দিয়েছেন যে, "এত কষ্টের হজ্ব যারা করবেন, হোক ফরয বা নফল,তারা যেন নির্ভরযোগ্য কোনো আলিমের তত্ত্বাবধানে পূর্ন প্রস্তুতি গ্রহন করে তারপরে যায় । তাহলে হজ্বের ন্যূনতম শুদ্ধতা নিশ্চিত হয় । আরো ভাল হয় প্রতিটি কাফেলায় একজন বিজ্ঞ আলিমের উপস্থিতি যদি নিশ্চিত করা যায়" । এই মেসেজটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ন সেটা বুঝতে পারবেন বৃদ্ধ বয়সে এসেও হাফেজ্জী হুজুরের জীবন্ত হজ্ব দেখে । অনেক কিছু শেখার আছে । তিনি ছিলেন সকলের অনুকরনের কেন্দ্রবিন্দু । যখনই লেখকের কোনো ভুল বা বিচ্যুতি ঘটতে যাচ্ছিল তখন তিনিই সংশোধন করে দিয়েছেন । তাই হজ্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দার সোহবত খুবই জরুরী । এতে হজ্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও অর্জিত হয় । আর সোহবতের এই গুরুত্বপূর্ন বিষয়টাই লেখক স্পষ্ট ভাবে, পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন ।
--------------
❒ কোরবানীর মাহাত্ন্য এবং সেটা যে কতটা আন্তরিকতার সাথে হওয়া উচিত সেটাও উঠে এসেছে এই সফরনামায় । আল্লাহর যেসব বান্দারা আন্তরিকতা নিয়ে কোরবানি করে তাদের আন্তরিকতার মাত্রাটা আরো বৃদ্ধি করার মতো একটা হৃদয় ছোঁয়া লেখনী এটা । রিভিউ পাঠকদের জন্য সেই লেখাটা হুবহু তুলে ধরছি, যারা বইটা পড়েনি তারা যেন বুঝতে পারে, লেখক কতোটা আবেগ আর ভালবাসা নিয়ে এই সফরনামার কলম ধরেছিলেন ।
.
✦ "আব্বাকে কোরবানি করতে দেখেছি । আব্বার সঙ্গে কোরবানির হাটে গিয়েছি বহুবার; প্রথমে অবুঝ আনন্দের আকর্ষণে,পরবর্তীতে কিছুটা অনুভব অনুভূতি সঙ্গে করে । কোরবানির হাটে আব্বাকে দেখেছি । কেমন দেখেছি তা হয়ত বুঝিয়ে বলতে পারবো না,শুধু বলতে পারি,সেখানে আব্বার মতো কাউকে কখনো দেখিনি । রওয়ানা হওয়ার আগে আব্বা দু'রাকাত নামায পড়েন । সে নামাযে আব্বার দাড়ি তো ভেজে জায়নামাযও ভেজে । মোনাজাতে সেকি কাকুতি-মিনতি ! দেখেছি, শিখতে পারিনি । খরিদ করার পর আব্বার প্রথম কাজ হলো পশুটিকে 'আদর' করা এবং আশ্চর্য, কোন পশুকে দেখিনি আব্বার আদর প্রত্যাখ্যান করতে !
কয়েকবছর আগে - আব্বার তখন খুব বিপর্যস্ত জীবন এবং জীবনে সেই একবার তিনি শরীকে কোরবানি করেছেন- কোরবানির হাটে আব্বার সঙ্গে আছি; দেখি, চোখে ধরে এমন একটি গাভীর দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলছেন, দিলের তামান্না, তোকে কোরবানি দেই, যাবি আমার সঙ্গে ! আমার যে তাওফীক নাই তোকে নেয়ার ।
প্রিয় পাঠক,এমন বাবার কোরবানি দেখা সন্তানকে কি ভাগ্যবান বলা যায় না ! প্রার্থনা করি,প্রতিটি মুসলিম সন্তান যেন দেখতে পায় আমার বাবার মত কোরবানি ।
আব্বা কোরবানির পশু বাড়িতে আনেন ঈদের দু'একদিন আগে । সেই পশুকে তিনি এমন যত্ন করেন যেন আদরের সন্তান ! কত বার যে তাঁর তিরস্কার শুনেছি গরুটার ঠিকমত 'খিদমত' হচ্ছে না বলে ! কোরবানির গরুর চারপাশে কয়েল জ্বেলে দেন, যাতে মশা কষ্ট না দেয় । একবার তো রীতিমত মশারি টানানোর ব্যবস্হা করেছিলেন ! হাসছো তুমি ! আমি কিন্তু সত্য কথা বলছি !
কোরবানির দিন আমরা গোসল করি ; আব্বা কোরবানির পশুকে 'স্নান' করান । ঈদের নামায পড়ে আসার পরে তিনি একেবারে বদলে যান ! আমার কাছে একেবারেই অচেনা হয়ে যান ! কোরবানির পশুকে যখন শোয়ানো হয় আব্বার চোখে তখন পানি এসে যায়, কখনো শব্দ করে কেঁদে ওঠেন । বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে যখন ছুরি চালান তাঁর বেচায়ন অবস্হা হয় দেখার মত; যেন পশুর গলায় নয় তিনি ছুরি বসিয়েছেন আপন সন্তানের গলায় ! এমন কোরবানি আমি আর কারো দেখিনি ! এমন মমতার সঙ্গে ছুরি হাতে নিলেই হয় কোরবানি, নইলে হয়ে যায় কসাই ও জবাই । কোরবানির প্রতিটি পশুকে আল্লাহ যেন দান করেন আমার বাবার মত কোরবানি 'কারনেওয়ালা' !
কথাগুলো কেন বললাম জানো ? গতবছর কোরবানির হাটে একটি দৃশ্য দেখেছিলাম, মনে হয়েছিলো, একটি 'পশু' একটি পশুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ! কোরবানির প্রতিটি পশুকে আল্লাহ যেন এমন পশু থেকে রক্ষা করেন ।
হে ভাই ! তুমি যখন কোরবানির হাটে যাবে, কোরবানির পশু খরিদ করবে এবং কোরবানির পশুর গলায় ছুরি চালাবে তখন আমার এ কথাগুলো মনে রেখো" । ✦
-
-
❒ দ্বিতীয় জামরা সম্পন্ন করার পর লেখক তার প্রত্যাশার সীমাহীন উচ্ছ্বাস নিয়ে, হৃদয়ের সবটুকু আকুতি ঢেলে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করলেন । সেই মুনাজাতের দু'আ গুলো ছিল আল্লাহর প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ । প্রতিটা দু'আর শেষে লেখকের সাথে সাথে আমিও "আমীন-আমীন" বলে ফেলেছিলাম অজান্তেই । শেষে মনে মনে এটাও বলেছিলাম,"হে আল্লাহ্, যে লেখকের লেখনীর মাধ্যমে তোমার ঘরের প্রতি আমার হৃদয়ের গহীনে ভালোবাসার বীজ বপন হয়েছে, তুমি তার ভুল ত্রুটিগুলোকে ক্ষমা করে দিও, তাকে উত্তম প্রতিদান দিও । তার ইহজীবন এবং পরজীবনের জন্য তুমিই যথেষ্ট হয়ে যেও ।
-
❒ এই গোটা সফরনামায় ৩টি বিষয় বারবার সামনে এসেছে । সেগুলো হচ্ছেঃ---
(১) সকল আমলের তাৎপর্য অনুধাবন করা এবং স্মৃতিকে জাগরূক রাখা ।
(২) হজ্ব ও হজ্বের বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত হয়ে নিজেকে দূর অতীতের মাঝে বিলীন করে দেয়া এবং তার সাথে অন্তরকে জুড়ে দেয়া । কারন এভাবেই হজ্বের আমলের নূর ও নূরনিয়াতের সৃষ্টি হতে পারে ।
(৩) সূক্ষ থেকে সূক্ষতর এবং উচ্চ থেকে উচ্চতর ভাব ও ভাবনা এবং আবেগ ও অনুভূতিন মাঝে নিমগ্ন থাকা ।
-
-
❖ পরিশেষে বলতে চাই,, এই সফরনামাটি দুই শ্রেনীর লোকের জন্য ।
[এক]--- যারা শীঘ্রই বাইতুল্লাহর মুসাফির হতে যাচ্ছেন । আর,
[দুই]--- যারা হজ্বের গুরুত্বের প্রতি উদাসীন ।
যারা মনে করে টাকা আছে হজ্বে না গেলে মানুষ কি মনে করবে ! কিংবা এলাকার লোকের কাছে "হাজী সাব" উপাধী পাওয়ার মানসিকতা নিয়ে থাকেন তাদের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনার জন্য বইটি এক কথায় অনবদ্য ।
যারা হজ্ব সম্পর্কে উদাসীন, আশা করি তারা এই বইটা পড়লে সফর থেকে লেখকের কুড়িয়ে আনা মুক্তো গুলো তাদের অন্তরে "বাইতুল্লাহ্ এবং নবীজির রওজা" নিয়ে স্বপ্নের এক নতুন ডানা মেলতে সাহায্য করবে । হৃদয়ে ভালোবাসার এক নতুন প্রদীপ প্রজ্বলিত হবে আর নতুন নতুন সব অনুভব-অনুভূতির তরঙ্গ দোলায় হৃদয় আন্দোলিত হবে ।
-
ভাই, আপনি যদি বাংলা সাহিত্যের অমৃত স্বাদ পেতে চান তাহলে কেন “বাইতুল্লাহর মুসাফির” পাঠ করছেন না ? আপনি যদি সাহিত্য দিয়ে আপনার হৃদয়কে আন্দোলিত করতে চান, তন্ময় হয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতে চান, তাহলে কেন “বাইতুল্লাহর মুসাফির” পাঠ করছেন না ??
হে পাঠক, আপনার জন্য করজোরে মিনতি রইলো মহান রবের নিকট একবার হলেও যেন মহান রব আপনাকে এই বইটি পড়ার সৌভাগ্য দান করেন । আমিন ।
.
.
➤ বইটি "দারুল কলম" প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়ঃ-- ২০০৯ সালে, রামাযান মাসে ।
➤ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ--- ৪৩১ ।
➤ নির্ধারিত মূল্যঃ---- ২০০ টাকা ।
➤ প্রচ্ছদঃ---- বশির মিছবাহ ।
.
==========================
-
 ▌ উপরের রিভিউটিতে আমি ৩ টি গুরুত্বপূর্ন বিষয়ের উপর লেখকের হৃদয় নিংড়ানো কথা গুলো বই থেকে হুবহু তুলে ধরেছি । সেগুলো হচ্ছে-----
(১) বিপদে পড়লে সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার গুরুত্ব ।
(২) পাঠকদেরকে "মা" এর প্রতি অনুগত হওয়ার উপদেশ বার্তাটি ।
আর....
(৩) লেখকের বাবার পশু কোরবানির জীবন্ত বর্ননা ।
----- এই তিনটি লেখা এ কারনেই হুবহু তুলে ধরেছি যে, যারা বইটি এখনো পড়েনি,তারা যেন লেখকের হৃদয় নিংড়ানো কথা গুলো পড়ে বইটি পড়ার আগ্রহ জন্মাতে পারে, তার সাহিত্য সৌন্দর্যের এক ঝলক দেখে নিতে পারে, মুগ্ধ হতে পারে ।
বইটি ৪৩১ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট একটি দীর্ঘ সফরনামা । যার কারনে এই রিভিউটাও দীর্ঘ হয়ে গেছে । যারা ধৈর্য ধরে এবং কষ্ট করে পুরো রিভিউটা শেষ পর্যন্ত পড়েছেন তাদের প্রতি রইল আন্তরিক ভালোবাসা । আল্লাহ্ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন । ▌
-