"শব্দতরু বিশেষ রিভিউ প্রতিযোগিতা নভেম্বর ২০১৯"

                      "মাগফিরাতের পথ ও পাথেয়"
                 ( নামটাই যেন পাপীকে কাছে টানে )

রবের অবাধ্যতায় 'কলব'টা গভীর আঁধারে ছেয়ে গেছে। মন্দ কাজ করতেই যেন এখন ওর ভালো লাগে। ইচ্ছে ছাড়াও কখনো কোনো ভালো কিছু হয়ে গেলে কাজটা যেন তার কাছে রসকষহীন মনে হয়। ভালোটা ভালো লাগে না, মন্দতেই স্বাদ পায় । আল্লাহতে সে প্রশান্তি পায় না, শান্তি খুজে পায় ইবলিসে।

এভাবেই উদ্ভ্রান্ত হয়ে চলতে থাকা একটি মনে হঠাৎ হিদায়াতের আলো ফুটে। এতদিনের করা ভুলগুলো সে বুঝতে পারে। লজ্জায়, অনুতাপে তখন মাথাটা নত হয়ে যায়। গোলাম তার আসল পরিচয় উপলব্ধি করতে পেরে কেঁদে মরে। কী করলাম এতদিন! রব কী আমায় ক্ষমা করবেন? আমার এতসব গোস্তাখি কী ক্ষমাযোগ্য? রবকে কীভাবে ডাকলে, কীভাবে বললে, কী করলে রবের দুয়ারে মাফ পেতে পারি? আমার মতো পাপীও কী রবের গুণাহমুক্ত প্রিয় গোলাম হতে পারে?

-------------------এসব প্রশ্নের উত্তর খুজেই ইবনু রজব হাম্বলি রহ. প্রতিটি পাপীর আরোগ্য লাভের মহা ঔষধ হিসেবে নিয়ে এসেছেন 'মাগফিরাতের পথ ও পাথেয়' নামক এই গ্রন্থ। এটি মূলত আলাদা কোনো গ্রন্থ নয়, বরং লেখকের জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ 'জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম' গ্রন্থের '৪২' নং হাদিসের অধীনে লেখা ব্যখ্যা, যা পরবর্তীতে 'আসবাবুল মাগফিরাহ' নামে পুস্তিকা আকারে বেরিয়েছে।

সংক্ষিপ্ত বই পরিচিতি :-

বই : মাগফিরাতের পথ ও পাথেয়
মূলগ্রন্থ : আসবাবুল মাগফিরাহ
রচনা : ইবনু রজব হাম্বলি রহ.
অনুবাদক : আহমাদ ইউসুফ শরীফ
প্রকাশনী : শব্দতরু
পৃষ্ঠা : ৬৪
মূল্য : ৮০ টাকা।

 'বড়দের বড় গুণ' বলে একটি কথা আছে। ছোট্ট এই পুস্তিকাটিতে তিনি অনেক কিছুর সমাহার ঘটিয়েছেন। একজন পথহারা পাপীকে পথের সন্ধান দিয়েছেন। একজন খোদাবিমূখ বান্দাকে খোদার পথে ফিরে আসার ফর্মূলা বাতলে দিয়েছেন। মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠার এই বইটিই দেখিয়ে দিতে পারে একজন পাপীর মাগফিরাতের পথ ও হয়ে উঠতে পারে সে পথে চলার পাথেয়।

মোটাদাগে 'মাগফিরাত লাভের তিনটি উপায়' নিয়েই আলোচনা হয়েছে পুরো বই জুড়ে। তবে বইয়ের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অমূল্য রত্ন। একজন পথহারা মানুষের পথের দিশা দিতে বলে গেছেন নানা পন্থা।

★ পাপী কত প্রকার ও কী কী? কার ভেতরের মূল সমস্যা কী? কার আরোগ্য কীসে?

- যেমন ধরুন, অনেকে ভুল বুঝতে পেরে দুআ করতে থাকে। মাফ চাইতে থাকে। তবে মনে জোর থাকে না। মাফ পাব কী পাব না, দুআ কবুল হবে কী হবে না--এমন একটা দ্বিধায় থেকেই দুআ করে যায়। কিন্তু এ-যে এক মহা সমস্যা। এই সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় দেখিয়েছে বইটি। এই সংক্রান্ত নানাবিধ সমস্যা খুটেখুটে বের করা হয়েছে এবং নববী বাণির সাহায্যে সেগুলো থেকে পরিত্রানের উপায় বাতলানো হয়েছে।

- অনেকে দুআ করে। মাফ চায়। কিন্তু হাত উঠিয়ে অন্যের দরবারে কিছু চাওয়ার সময়টাতেও এমন একটা ভাব নিয়ে থাকে যেন সে রাজাধিরাজ। অথচ তার কাছে অন্য ভিক্ষুক কিছু চাইতে আসলে সে চায় অনুনয় বিনয় করে কিছু চাক। এই কাজটা কেউ করে দুআর সঠিক নিয়ম না বুঝে, কেউ করে মনের মরজের প্রভাবে। তাই অন্যের কাছে চাইতে গেলে, আবার যদি তিনি হন সব 'অন্যের' স্রষ্টা ও মালিক, তার কাছে চাইতে গিয়ে দুআয় নিজের অবস্থা কেমন হওয়া দরকার-- সেসব দিকনির্দেশনা এসেছে কুরআন সুন্নাহর হাত ধরে।

- যারা সবসময় নগদে অভ্যস্থ, তাদের কেউ যখন পাপ ছেড়ে পূণ্যে ফেরার লক্ষ্যে হাত তুলে, তখন এক-দুই-তিন দিন পর না পেয়ে নিরাশ হয়ে পড়ে। এসব রোগীর প্যারাসিটামলও দেয়া আছে বইটিতে।

- কেউ কেউ অন্য কোনো দিন না এলেও শুক্রবারে আসে নামাজে। তখনো নামাজে এসে ফাতিহায় ' আমরা তোমার কাছেই সাহায্য চাই' বললেও মসজিদের চৌকাঠ পেরিয়েই অন্যের সামনে হাতটা পেতে দেয়। দ্বীন-দুনিয়া--- দুই ক্ষেত্রেই গাইরুল্লাহর অংশীদারিত্ব পুষে রাখে অন্তরে। এসব লোকদেরকেও নবীজির এ-সংক্রান্ত বাণিগুলো শুনানো হয়েছে।

- কেউ কেউ ভাবে, পাপে ভরা জীবন আমার, ক্ষমা পাব কী? এই শ্রেণির হতাশদেরকে বেশকিছু হাদীস ও মনীষিদের বাণির আলোকে বুঝিয়েছেন, দেখো ভাই! বান্দার গুনাহের তুলনায় আল্লাহর ক্ষমা সীমাহীন।

- অনেকে আবার এমনও আছে, যারা মাফ পেতে চায় তবে মাফ চাইতে চায় না। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির ইস্তিগফারের দৃষ্টান্ত টেনে তাদের হৃদয়রাজ্যে প্রশ্ন রাখা হয়েছে---তাহলে কী তার চেয়ে তুমি শ্রেষ্ঠ?

- ইস্তিগফার ও তওবাহ। দুটি সাধারণত একসাথে ব্যবহার হলেও দুটোর মাঝে কিছু পার্থক্য আছে। বইটিতে সেই পার্থক্যগুলো দেখানো হয়েছে। তবে অর্থের দিক বিবেচনায় দুটির একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একই সাথে তওবাহ ও ইস্তিগফারের হাকীকত ও বিধান নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

- কারো কারো ইস্তিগফার তার দুআ কবুলের পথে উল্টো বাধা হয়ে দাড়ায়। কী, চোখ কপালে উঠে গেল বুঝি? আমি বলছি না৷ বলছে এই বইটি। এমনটা কেন হয়, কি করলে আর কি ছাড়লে আর এমন হবে না--এসবও বলেছে বইটি।

- তবে কোন ইস্তিগফার বাধা হয়ে তো দাড়াবেই না, বরং তা পূর্ণ ও মকবূল হবে তার স্বরূপও বাতলে দেওয়া হয়েছে বইটিতে। দেওয়া হয়েছে ইস্তিগফারের উত্তম পদ্ধতির বর্ণনা।

- প্রশ্ন রয়ে যায়, ইস্তিগফার লাগবে বুঝলাম তবে দৈনিক কতবার? উত্তরটা এসেছে নবীজির বেশ কিছু বাণি থেকেই।

- পাপমোচনে ইস্তিগফারের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বইটিতে।

- সর্বশেষ তাওহীদ ও মাগফিরাতের উপযুক্ত তাওহীদের স্বরূপ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এসেছে৷


* গুণগত মানঃ
শব্দতরুর প্রতিটি বইয়ের গুণগতমানই প্রশংসার দাবিদার। প্রচ্ছদটা বেশ অর্থবহ। আধারের বুক চিরে দু'ফোটা অশ্রু। কভার, বাইন্ডিং, ভেতরের পাতা সবই উন্নতমানের। অনুবাদও বেশ ঝরঝরে। পড়তে বিরক্তি আসে না। বিশেষত অনুবাদকের কবিতার হাত প্রশংসা কুড়ানোর মতোই। কবিতার অনুবাদগুলো বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

* সমালোচনার চশমা পরেঃ
তবে কিছু কিছু জায়গায় হাদীসের সূত্র নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে এসেছে৷ এতে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুরকমই বলা যায়। একজন মুহাক্কিকের কাছে বিষয়টা ভালো লাগলেও একজন জেনারেল শিক্ষিত মানুষ বিরক্তিবোধ করবেন। কেননা বইটি এমনিতেই ছোট। তাছাড়া বইটি মূলত পাপ থেকে পূণ্যে ফেরা মানুষদের জন্য। তাই মূল বইয়ে থাকলেও অনুবাদে বিষয়টা কমিয়ে আনলে ভালো হতো। পাঠক মূল আলোচনায় ফোকাস করতে পারত।

কিছু জায়গায় টাইপিংয়ের সমস্যা চোখে পড়েছে। আশা করি পরের বার শুধরে নেওয়া হবে।

প্রিয় পাঠক!
বইটি ছোট। দামও অল্প। তবে 'মানে' কিন্তু অনেক বড়। বইটি পাপীমনে আলো ছড়ায়, উদাস মনে প্রেরণা আনে, হতাশ হৃদয়ে সাহস যোগায়। মোটকথা আমার আপনার মাগফিরাতের পথে সংক্ষিপ্ত দিকনির্দেশনা দিতে অনন্য একটি বই।

#ইসলামি_বই_রিভিউ_প্রতিযোগিতা_নভেম্বর_২০১৯