.
বইঃ- সবুজ রাতের কোলাজ
লেখকঃ- আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব
প্রকাশকঃ- সমকালীন প্রকাশন
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ- ৮৭
মূদ্রিত মূল্যঃ- ১২০ টাকা
ধরনঃ- কাব্যগ্রন্থ
.
ছড়া-কবিতা মানুষের মনকে স্বল্প সময়ে উজ্জিবীত করার জন্য অন্যতম নিয়ামক। সেই সাথে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইদানীং কবিতায় এমন সব কথা ও শব্দ ব্যবহার করা হয় যা সাধারণ পাঠক পড়ে কিছু বুঝতে পারাটা দূর্বোধ্য । কিছু কিছু লিখা দেখলও তো মনে হয় লেখক কবিতা না লিখে বাক্যের অন্ত্যমিল রক্ষার দিকেই বেশি জোর দিয়েছেন। এত কিছুর ভিড়ে আমার পড়া অন্যতম একটি কাব্যগ্রন্থ হলো "সবুজ রাতের কোলাজ"। যে বইয়ের সবকয়টি কবিতা পড়ে কখনো বিরক্তি আসে নি । একেকটি কবিতা যেন এক অভূতপূর্ব মায়াজালে জড়িয়ে রাখছে।
কাব্যগ্রন্থটির লেখক আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজিব। যিনি বাংলাদেশের একজন তরুন কবি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী বিভাগে অধ্যয়নরত। এছাড়াও তিনি যুক্ত আছেন লিটলম্যাগ সম্পাদনার সাথে। এ পর্যন্ত তার চারটি কাব্যগ্রন্থ ও তিনটি ইসলামি প্রবন্ধগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে।
সবুজ রাতের কোলাজ কাব্যগ্রন্থটিতে কবির ৫১ টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে কিছু অনুবাদ কবিতা ও কয়েকটি ইংরেজি কবিতাও স্থান পেয়েছে।
এক্ষনে আমি বইটি সম্পর্কে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো। ইনশাআল্লাহ্-
.
☸ সার-সংক্ষেপঃ-☸
বইটির প্রথম কবিতার নাম হলো "নাইয়র কাব্য"। এটি একটি ৭৮ লাইনের নাতিদীর্ঘ কবিতা। এই কবিতায় দেখানো হয়েছে গ্রামের বাড়িতে নতুন জামাই আগমনের সময়কার জাকজমকপূর্ণ আয়োজন। সেই সাথে ফুটে উঠেছে জামাই আগমন কেন্দ্রিক অপেক্ষা ও পরিবেশের প্রতিচ্ছবি । মূল বইয়ের একটুখানি স্বাদ পেতে হলে পড়ুন এই কবিতাটির প্রথম চার লাইন-
        ‘আমার যে আর কাটে না প্রহর কাল গুনে
        মেয়ে বলেছিলো আসবে নাইয়র ফালগুনে
        বানিয়ে রেখেছি চিতই এবং তালপিঠা
        সগিরের বাপ, জলদি পাঠাও পালকিটা।
এবার পড়ুন বই থেকে পুরো একটি কবিতা-
    অনুবাদে তনু বাদ
আপনারা যা করেন, এসব কি অনুবাদ?
ছায়াটুকু নিয়ে এসে কবিতার তনু বাদ!
কেউ শুধু তনু দেখে, খোজ নেই প্রাণ্টার
ফুলের কি দাম আছে, না থাকলে ঘ্রাণ তার?
এই কথা ঐ কথা সবখানে কথা কত !
খুব কম লোকে করে অনুবাদ যথাযথ।

*****
কাব্যগ্রন্থটিতে মোটামুটি পাচ ধরনের কবিতা লক্ষ্য করা যায়। যথা-
(১) প্রকৃতির বর্ণনা সমৃদ্ধ কবিতাঃ- এসব কবিতায় ফুটে উঠেছে উঠেছে গ্রামীণ মানুষের জীবনধারা, প্রকৃতি ও পরিবেশ মনোমুগ্ধকর বর্ণনা। এরকম কবিতা গুলো হলো- আমাদের দিনরাত, বর্ষা না বর্শা, নববধু, রাতের কাছে প্রশ্ন আছে ইত্যাদি।
.
(২) পারিবারিক কবিতাঃ- পরিবারের সদস্যদের আচার আচরণ, সম্পর্কের উপলদ্ধি, পরিবার কেন্দ্রিক ভবিষ্যত চিন্তাধারা, ইত্যাদি ফুটে উঠেছে এসব কবিতায়। আরো এসেছে পরিবার কেন্দ্রিক কবির স্বপ্ন ও কল্পনার দিকটিও। এই ধরনের কবিতা গুলো হলো- আম্মু , যেদিন আমি বাবা হবো, এখন আমি বাবা, মাঝখানে আমি, আব্বুম্মু , যেদিন আমি দাদা হবো, বাবা, অনাগতার প্রতি ইত্যাদি।
.
(৩) ইসলামী ভাবধারাপূর্ণ কবিতাঃ লেখক সবচেয়ে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন ইসলামী কবিতাগুলো লেখার ক্ষেত্রে। এসব কবিতার মধ্যে কয়েকটি হলো- ঝড়ের স্রষ্টা কে, বখতিয়ার, সবুজ রাতের কোলাজ, নবীজির জন্য এলিজি, আরাফার দিনে, আকসার চিরকুট, শেষ রাত্রির কবিতা, শেরে মহীশুর ইত্যাদি।
.
(৪) বিভিন্ন অসংগতিপূর্ণ কবিতাঃ এসব কবিতায় ফুটে উঠেছে বিভিন্ন অসংগতির প্রতিচ্ছবি ও জীবনে চরম বাস্তবতার কথা। এই টাইপের কবিতাগুলো হলো- হাতবদল, ইদানীং, অনুবাদে তনুবাদ, কেন আমি কবি, দোষটা আমার, প্রতিউত্তর ইত্যাদি।
.
(৫) আবেগ ও অনূভুতি সূচক কবিতাঃ এসব কবিতায় উঠে এসেছে বিভিন্ন আবেগ, অনূভুতি, ও ভালোবাসার কথা। যথা- প্রথম সাক্ষাতের দ্বিতীয় অনূভুতি, অভিমান বন্দনা, আশার নাম ঝুমকো ফুল, আমার হৃদয়, বালুচরে লেখা নাম, আমি তো জানি না ইত্যাদি।
এগুলো ছাড়াও আরো বেশকিছু বৈচিত্র্যময় কবিতা পাওয়া যাবে উক্ত কাব্যগ্রন্থটিতে।
*****
এক্ষনে ভালো লাগা দুটি কবিতার কথা না বললেই নয়। তার মধ্যে একটির নাম " অধরা স্বপ্ন "। এটি বইয়ের সবচাইতে ছোট কবিতা। কবিতার ব্যাপ্তি মাত্র দুই লাইন। কবিতাটি হলো-
স্বপ্নের ঘোরে শুধু ডাকে কাবা চত্বর,
লাব্বাইক ধ্বনি তুলে চলে আয় সত্ত্বর।
লক্ষ্য করে দেখুন মাত্র দুই লাইনের মধ্যেই কত অনূভুতি, স্বপ্ন, ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
অপর কবিতাটা হলো "প্রত্যাবর্তন"। এতদিন পর্যন্ত বাংলায় আমার পড়া সবচেয়ে বড় কবিতা ছিলো কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও জসীম উদ্দিনের কবর কবিতা। বড় কবিতার তালিকায় প্রত্যাবর্তন কবিতাটিও যুক্ত হলো। কবিতার ব্যাপ্তি ১০ পৃষ্ঠা। লাইন সংখ্যা ২১৬ । এই কবিতায় উঠে এসেছে মা, বোন, স্বামী, প্রিয়তমা, ও সন্তানদের নিয়ে ঘটে যাওয়া কিছু বর্ণনা। কুরআন হিফজ করার জন্য এক যুবকের ব্যাকুলতা। অবশেষে দীর্ঘ পাচমাস পরিবারের অগোচরে সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করে ফিরে আসা এবং এ নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা কথা।
*****
বইতে কবি অন্ত্যমিল ও গদ্য ছন্দ দু ধরনের কবিতাই লিখেছেন। পড়ার সময় কখনো মনে হচ্ছে অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতা গুলো ভালো আবার গদ্য ছন্দে কবিতা গুলো পড়ার সময় মনে হচ্ছে এগুলোই ভালো। অতএব বুঝা যাচ্ছে অন্ত্যমিল ও গদ্যছন্দ দুই দুই ধরনের কবিতাতেই লেখকের খুব ভালো মুন্সিয়ানা রয়েছে।
কবিতা লেখার ক্ষেত্রে লেখক কতটুকু দক্ষ তার আরেকটি প্রমাণ হলো বইতে লেখকের মৌলিক কবিতার পাশাপাশি ১৪ টি অনুবাদ কবিতা রয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন আরবী ও ইংরেজি কবিতা থেকে অনুবাদ করা।
বইতে পাবেন লেখকের তিনটি ইংরেজি কবিতা। এছাড়াও ভূমিকায় লেখক লিখেছেন ইংরেজি কবিতার পাশাপাশি তিনি আরবী কবিতাও লিখতে পারেন। যদিও বইতে আরবী কবিতা নেই।
.
☸ ব্যক্তিগত অনুভূতিঃ-☸
বইয়ের কভার, প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং, ও ভিতরের পাতা মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর। ব্যক্তিগত অনূভুতি যদি বলতে হয় তাহলে বলবো বইটি এককথায় অসাধারন। কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে কখনো মনে হয়নি এই কবিতাটা ভালো নয় । বরং প্রতিটা কবিতাই যথেষ্ট সহজ ও সাবলীল, ও বোধগম্য ভাষায় রচিত রচিত বলে মনে হয়েছে। কোন কবিতা অন্ত্যমিলের সাহায্যে আবার কোনটি গদ্য ছন্দে লেখা। চাইলে ৫১ -টি কবিতার প্রত্যেকটি কবিতা নিয়েই একটি করে রিভিউ লেখা সম্ভব।
এমন খুব কম বই আছে যার প্রতিটি বাক্য ভালোলাগার, প্রতিটি পাতায় মিশে থাকে জ্ঞানের ছোয়া ও শিক্ষণীয় উপাদান। " সবুজ রাতের কোলাজ " কাব্যগ্রন্থটি তার মধ্যে অন্যতম।
ভালোলাগার আরেকটি বিষয় হলো গতানুগতিক দেখা যায় কবিতার নাম দেয়া হয় শেষ লাইন বা প্যারা থেকে। কিন্তু সবুজ রাতের কোলাজ বইতে কবিতাগুলোর নামকরণ করা হয়েছে কবিতার মূলভাব কে কেন্দ্র করে। কবিতা গুলোর শেষ প্যারায় বা শেষের দুই লাইনে আছে মূল মেসেজ, শিক্ষণীয় বিষয়, বা কোন টার্ণ।
সব মিলিয়ে বইটি খুবই ভালো এবং উপকারী।
তাই এ জাতীয় কাব্যগ্রন্থ কবিতাপ্রেমী সকলের জন্য একবার হলেও পড়া উচিৎ।
.
**শেষ কথা:-**
কবিতা লেখায় লেখকের আরো উত্তরোত্তর আরো সমৃদ্ধি ঘটুক। কবিতা নিয়ে এত সুন্দর একটি কাব্যগ্রন্থ পাঠকের সমীপে উপস্থাপন করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বইয়ের লেখক, প্রকাশক সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কবুল করুন। দোয়া করি আল্লাহ যেন লেখকের জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে নেক হায়াত দান করেন এবং দ্বীনের পথে তার এই পরিশ্রম কবুল করেন।
,