#ওয়াফিলাইফ_পাঠকের_ভাল_লাগা_জানুয়ারি_২০২০


                          ||তাতারীদের ইতিহাস||


তাতারীদের ইতিহাস। তাতারদের সম্পর্কে ছোট্টবেলা থেকেই নানা কথা শুনি। তখন থেকেই বর্বর এক জাতি হিসেবে ওরা পরিচিতি পায় আমার মনে। ওদের নিয়ে বিস্তারিত জানার আগ্রহ তখন থেকেই। তাই ভালো মানের বই খুজতাম সবসময়ই। হঠাৎ একদিন বাংলাবাজার বইটা দেখে লুফে নেই সাথে সাথে। তাছাড়া হাসান সম্পর্কে জানাশোনা আছে আগে থেকেই, জানতাম লেখক সম্পর্কেও। তাই অন্তরও সাক্ষ্য দিলো বইটা ভালো হওয়ার ব্যাপারে। তর সইছিল না। বাসায় ফেরার পথে গাড়িতে বসেই পড়তে শুরু করে দেই। দেড় দিনেই শেষ করে ফেলি বইটি। 


                        |পাঠ প্রতিক্রিয়া|

বইটি আমায় অনেক কাঁদিয়েছে। জীবনে খুব বেশি বই পড়ে আমি কাঁদিনি। তবে কেঁদেছি এই বইটি পড়ে। খুব কেঁদেছি। মানুষ মানুষের উপর এভাবেও নির্যাতন করতে পারে! এমন নির্মম হত্যাযজ্ঞ কোনো মানুষ চালাতে পারে! এরা কি আমাদের মতোই রক্তে মাংসের মানুষ ছিল! তবে কিভাবে পারল তারা মানুষ হয়ে! মনগুলো কি একবারও কেপে উঠল না! 


বেশ কয়েকবার এমনও হয়েছে যে, ওদের নির্মম হত্যাকান্ড আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। হৃদয়বিদারক করুণ কাহিনী আমাকে সামনে এগুতে দেয়নি। পারিনি। বইটা বন্ধ করে ঝিম ধরে বসে ছিলাম। চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরেছে। কিছুই ভাবতে পারিনি। এ-ও সম্ভব! আমার কান আগে কখনো এমন নির্মমতার কথা শুনেনি, আমার চোখ কখনো এমন নির্মমতা দেখেনি। আমার মন কখনো কল্পনাও করেনি। 


অন্যদিকে বারবার হতাশ হয়েছি মুসলমানদের ঈমানী দূর্বলতা দেখে। বারবার প্রশ্ন এসেছে মনে, আমরা কি আসলেই খালিদ বিন ওয়ালিদ, সালাউদ্দীন আইয়ূবীর উত্তরসূরী! আমরাই কি শ্রেষ্ঠ জাতি! তবে কেন আমাদের এই দূরাবস্থা! আমরা কেন কাফেরদের ভয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে থাকব!  


আর হ্যা - প্রচ্ছদ, বাধাই ভালো হয়েছে। অনুবাদ সুখপাঠ্য, তবে কিছু জায়গায় আরো ভালো হতে পারত। সব মিলিয়ে আপত্তির তেমন কিছু নেই।


                 |কেন পড়বেন বইটি?|


'তাতারীদের ইতিহাস' গ্রন্থটি ষষ্ঠ শতাব্দীতে মুসলিম সাম্রাজ্যের উপর হানা দেওয়া রক্তচোষা তাতারী আগ্রাসনের ইতিহাস নিয়ে রচিত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. রাগেব সারাজানী বর্বর তাতারীদের ঘৃন্য জঘন্য ইতিহাস নিয়ে রচনা করেছন গ্রন্থটি। 


তাতারীদের বর্বরতা মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইতিহাস; বরং এভাবে বললে অত্যুক্তি হবে না যে, সর্বদিক বিবেচনায় পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস তাতারীদের এই ইতিহাস।


রাগিব সারজানি আমাদের বাংলায় এখন পরিচিত এক নাম। ঐতিহাসিক হিসেবে তিনি বাংলাভাষী পাঠক মহলে বেশ পরিচিত ও সর্বজনগৃহীত ব্যক্তিত্ব। তার লেখনীর অন্যতম বৈশিষ্ট হলো, তার লেখায় কেবল ইতিহাসই উঠে আসে না, বরং ইতিহাস থেকে চালনীর ছাচে বের করে আনা হয় বিভিন্ন শিক্ষা। তখনকার ঘটনাগুলোকে মিলিয়ে দেখানো হয় আমাদের যুগের সাথে। ফলে উম্মাহ পেয়ে যায় চিন্তার খোরাক, খুজে পায় মুক্তির দিশা। 

এই বইটিও তেমনি, ব্যতিক্রম কিছু নয়। বইয়ের ভূমিকায় লেখক যথার্থই বলেছেন- '"আমরা কেবল উত্থান পতনের ইতিহাস গবেষণার জন্য বক্ষ্যমান গ্রন্থ রচনা করিনি; বরং সেই সব কারণ অনুসন্ধানের জন্য রচনা করেছি, যদ্দরুণ জাতির উন্নতি ও অবনতি ঘটে। ইতিহাস তো বারংবার পুনরাবৃত্ত হয় আশ্চর্য মহিমায়।"


ধারাবাহিক বর্ণনা, তথ্যের সহজ উপস্থাপন, কাহিনীর বিন্যাস, জয়-পরাজয়ের যৌক্তিক, স্পষ্ট ও প্রকৃত কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। মুসলমানদের মাথায় উঠিয়ে রাখতে ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো হয়নি। বরং লেখক উচিৎটা বলে গেছেন নিরপেক্ষতার চশমা লাগিয়ে। 


লেখক ইতিহাসের নিরিখে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মুসলমানদের পরাজয়ের কারণ, বের করে এনেছেন আমাদের জন্য শিক্ষা ও বলে দিয়েছেন আমাদের বর্তমান করনীয়। তিনি কখনো মমতার হাত বুলিয়ে, কখনো বা ধমকের সুরে বারবার জাগিয়ে তুলেছেন মুসলিমদের ঈমানীসত্ত্বাকে। পূর্বেকার ঘটনাগুলোকে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন, তখনকার গাফেলরা কী করেছিল আর আমরা এখন কী করছি এসবও বলে গেছেন নির্দ্বিধায়। তাদের থেকে কী কাম্য ছিল আর তারা কী করেছে, এবং আমাদের কী করনীয় আর আমরা কী করে যাচ্ছি এসব সূক্ষ বিষয়গুলো তুলে এনেছেন ইতিহাসের শিক্ষা থেকে। ঘটনার বিভিন্ন দিককে কুরআন হাদীসের সুসংবাদ, সতর্কবানি ও ঘোষিত পরিণতির সাথে মিলিয়ে দেখিয়েছেন। 


আমাদের গর্বের ধন প্রিয় কুতয ও তার বিজয়াভিযানগুলো তুলে ধরেছেন খুবই যত্নের সাথে। বর্ণনা করেছেন তার চারিত্রিক উৎকৃষ্টতা, সামরিক অভিজ্ঞতা ও দুনিয়া বিমুখতার কথা।অচেতন মুসলিমদের ঈমান জাগানিয়া কর্মপন্থার কথাও আলোচনা করেছেন খুব দরদ নিয়ে।পারস্পরিক আত্মকলহের অপনোদন করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তিনি কিভাবে বেধেছিলেন গোটা জাতিকে, সেই অভূতপূর্ব কর্মপন্থা আলোচনায় এনেছেন খুব সতর্কতার সাথে।


তাতারীদের ইতিহাস আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে। অথচ এনিয়ে আমাদের জানা দরকার, অতিব জরুরী। সাইফুদ্দীন কুতুয! আমাদের চেতনার আদর্শ! আমাদের গর্বের ধন! 


                          |পরিশিষ্ট|

পরিশোষে বলব, আপনি যদি বই-পাঠক হয়ে থাকেন, বরং যদি পাঠে অভ্যস্ত না-ও হয়ে থাকেন, তবুও বলব, এই বইটি পড়ুন! মনটা একটু হলেও নরম হবে। শহীদদের জন্য মন থেকে দুআ আসবে। 

আপনি যদি ইসলামিক মাইন্ডের না-ও হোন, এমনিতেই একজন ইতিহাস প্রেমী হয়ে থাকেন তবুও বইটি পড়ুন! ভালো ও উপকারী কিছু আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।


আল্লাহ প্রিয় কুতয, রুকন উদ্দীন বাইবার্স সহ অন্য সকল মুজাহিদ ও মজলুম শহীদদের জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন! আমীন!


                        |সংক্ষিপ্ত বই পরিচিতি|


বই:..................তাতারীদের ইতিহাস

লেখক:.............ড. রাগেব সারজানী

অনুবাদক:.........মাওলানা আবদুল আলীম

সম্পাদনা:..........মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

প্রকাশনায়:.........মাকতাবাতুল হাসান

মুদ্রিত মূল্য:........৪৪০টাকা-----ছাড় মূল্যঃ২২০ টাকা

পৃষ্ঠা সংখ্যা:........৪০০