বইঃ মা, মা, মা এবং বাবা
সম্পাদকঃ আরিফ আজাদ
জনরাঃ ইসলামিক গল্প
প্রকাশকঃ সমকালীন প্রকাশন
প্রকাশকালঃ সেপ্টেম্বর ২০১৮
পৃষ্ঠাঃ ১৭৫
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৩৫ টাকা

বাহ! আমি লিখেছিলাম?
আলহাদুলিল্লাহ ।


০৭/১০/২০১৮
ঘুম ঘুম দুপুরে ব্যাগপত্র গুছিয়েছি। একটা কাজে হুট করেই মোমেনশাহী যেতে হবে। বাসে চরম বিরক্তি লাগে। তাছাড়া ট্রেনে আমার ভালো লাগে। বিকালের ট্রেনে ভীর হয় অনেক। তাই সন্ধ্যার পরের ট্রেনে যাবো বলে ঠিক করি। আছরের পর বাসায় বসে বসে ফেসবুকে দৌড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা পোষ্ট চোখে পড়ে। চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
বাল্যকালের বন্ধু 'মা মা মা এবং বাবা' বইটা কিনে পাঠাভ্যাস গ্রুপে পোষ্ট দিয়েছে। আগে জানলে আমিও একটা আনতে বলতাম। যাইহোক, সন্ধ্যার আগে আগে রেডি হয়ে বন্ধুর দোকানে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম বইটা কোথায়? একটু দাও কভারটা দেখি। নতুন বই, একটু গন্ধ নেই!
প্রথমে দিতে না চাইলেও জোড়াজোড়িতে সিন্ধুক খুলে বের করলো। হাতে নিলাম। সেই নিজের ইচ্ছায় বলে বসলো অর্ধেক পড়ে ফেলেছি। গতকাল রাতে। এবার খানিকটা রাগ হলো! গতকাল রাতে মানে! তারমানে কাল কিনেছো! হাসতে হাসতে স্বীকার করে নেয়। জানায়নি তার কারণ বইটা হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে বলে। আমিও হাসতে হাসতে বললাম তাহলে নিয়ে চললাম। পরশু পাবে। তার এক কথা না না না! আগে পড়ে নেই। তারপর নিও। আমরা বই কিনে সব সময় ভাগাভাগি করেই পড়ি। নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝে এটা নিয়ে লাগেও বেশ, কে কোন বইটা আগে পড়বে! আমার জোরাজুরির কাছে অবশেষে হার মেনে নিলেন ঈমাম সাহেব। মানে বাল্যকালের বন্ধু, আবার মহল্লার মদজিদে ইমামতিও করে।
ব্যাগপত্রর নিয়ে ষ্টেশনে গিয়ে টিকেট কাটলাম। সাথে আরেকজন জুটে গেল। আমার বোনের দেবর। যাবে জামালপুর।তার গ্রামের বাড়ি। ভাগ্যভালো সীট পেলাম। আমি ১০ সে ১৮ নাম্বার। নির্ধারিত সময়েই ট্রেন আসে। উঠে গিয়ে বসলাম। অনেক সীট খালি ছিল।
ট্রেনে লাইটের আলোটা কম। হলুদ বাতি। এবার বইটা ব্যাগ থেকে বের করে চোখের সামনে ধরলাম। নতুন বই এর গন্ধ নিলাম। প্রচ্ছদ উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখলাম। একটি ছোট্ট হাতের পাঁচটি আঙুল ধরে আছে বড় বড় হাতের বড় বড় আঙুল।
আমার একটা অভ্যাস, বই পড়া শুরু করার আগে পিছনের লেখা থাকলে সেটা পড়ে নেই। এখানেও তাই পড়লাম। পিছনের লেখাটা হৃদয় ছুঁয়ে গেল। তারপর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সব কিছু অন্ধকার দেখা যায়। ট্রেন ছুটে চলেছে, ঝন ঝনা ঝন।
এবার আশেপাশের মানুষের দিকে তাকালাম। আমার সামনেই একজন মহিলা ও একজন পুরুষ। আমাকে পরখ করে দেখছে। পাশে ইয়ো ইয়ো টাইপের একটা ছেলে। কানে ইয়া বড় বড় হেড ফোন লাগিয়ে, হয়তো গান শুনছে। অন্যপাশে একজন মুরুব্বি লোক আমার হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে আছে। মুরুব্বির সাথেই একটা মহিলা আমাকে দেখছে। সুন্দর চোখ। কাজল নেই। তবে মায়াবি। এক পলক দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছি। নয়তো আবার যদি চোখের মায়ায় পড়ে যাই! তাদের ঠিক সামনে দুইটা লোক। একজন লুঙি পড়া। আরেকজন কোর্ট প্যান্ট। এবার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলাম বই এর দিকে।
''মা মা মা এবং বাবা'' বইটা প্রকাশিত হয়েছে 'সমকালীন প্রকাশন' থেকে। সম্পাদনা করেছেন 'প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ' ও 'আরজ আলী সমীপে' বই এর লেখক 'আরিফ আজাদ'। প্রচ্ছদ মূল্য ২৩৫ টাকা। পেজ কোয়ালিটি, মাশা-আল্লাহ। ধরলে এবং দেখলেই ধনী ধনী মনে হয়।
শুরুটা হয় পবিত্র কোরআন এর একটি আয়াত দিয়ে, "হে আমার রব, তাদের প্রতি সেভাবে দয়া করুণ যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন। [বনি ইসরাইল ২৩, ২৪]
তারপরের পেজ দখল করে আছে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র একটি হাদীছ দিয়ে। হাদীছটি বহুল প্রচলিত। রাসূল (সাঃ) কে বাবা মায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রথম তিনবার মায়ের হকের কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ বার বাবার কথা বলা হয়।
তারপর প্রকাশকের কথা, সম্পাদকের কথা পড়ে যেটা মনে হচ্ছিল বইটা বেশ আলোচনায় আসবে। সম্পাদক তো একবার বলেও ফেলেছেন তার নিজের 'প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ' বই যতজন মানুষের হাতে পৌঁছেছে তাকেও ছাড়িয়ে যাবে এই বইটি।
সূচী পত্রে চোখ বুলালাম। বইটির দু'টি অংশ। প্রথম অংশটির নাম 'জীবন থেকে নেওয়া'। এখানে ৩৫ টি গল্প লেখা আছে। দ্বিতীয় অংশের নাম 'কুর'আর ও হাদিছ থেকে নেওয়া'। এখানে ৯ টি ঘটনার আলোচনা দেখা যায় সূচিপত্রে।
বাহিরে তাকিয়ে চোখ এবার কচলিয়ে পড়া শুরু করলাম নিয়ন আলোর মাঝে। প্রথম গল্পটাকে ঠিক গল্প বলা যায় না। কোন আঙ্গিকে গল্প হয় তাও বুঝে আসে না। এক মা তার সন্তান তরে একটি চিঠি লিখে। চিঠিটা পড়ছিলাম আর হিমশিম খাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার নিজের মা'ই আমাকে এই চিঠিটা লিখেছে। চিঠিতে যেন মা আমাকে বলছে, আমার অস্তিত্বের আগে থেকে শুরু করে অস্তিত্বে আসা। তার অভ্যন্তরে বেড়ে উঠা। তাকে অসীম যন্ত্রনা দিয়ে দুনিয়ার আলোয় আসা। বেড়ে উঠা। তারপর বুঝতে শেখা। এর মধ্যে কতশত স্মৃতি। এতকিছু ভুলে মায়ের ছোট্ট খোকাটা বড় হয়ে যেন অন্য কাউকে নিজের দুঃখ সুখের সঙ্গী করে নেয়। মাকে ভুলে। তবুও মায়ের কোন অভিযোগ নেই। আসলেই মায়েদের কোন অভিযোগ থাকে না।
দ্বিতীয় গল্প ছিল এক বাবার আত্মজীবনী। তার নিজের করা অপরাধের সরল স্বীকারোক্তি। তিনি কেন এই স্বীকারোক্তি দিলেন। তারও কিছু কারণ আছে। তার অন্যতম কারণ হলো তার অন্ধ পুত্র সালেম। সালেমের জন্মের দিন তিনি এক কে ল্যাঙ মেরে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। তারপর তার একটা অন্ধ পুত্র হয়। এমন সন্তান জন্ম দিয়ে তার স্ত্রী স্বাভাবিক থাকেন। তাদের ঘিরেই গল্পটা এগিয়ে চলে। সালেম বড় হয়। সালেমকে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তার আরো সন্তান হয়। ১০ বছর কেটে যায়। একদিন তিনি কোন এক দাওয়াতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ সালেমের কান্নার শব্দ শুনে প্রথম বারের মত সালেমের কাছে যায়, জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু সালেম যেন তার থেকে দূরে সরে যায়। শেষে কান্নার কারণ উৎঘাটন করে সমস্যা সমাধানের জন্য নিয়ে যায় মসজিদে। মসজিদে সবাই সালেমকে চিনে। তিনিও সেদিন অনেক বছর পরে নামাজ পড়েন। তারপর, সালেমের ধর্মভীরুতা দেখে তিনি নিজের অন্ধত্ব আবিষ্কার করেন। সত্য পথে আসেন। তারপর ভালো মানুষদের সহবতে সময় কাটান। একদিন দূরে যান দাওয়াতি কাজে। ফিরে এসে সালেমের ছোট ভাইকে জিজ্ঞাসা করেন সালেমের কথা। সহজ উত্তর দেয়, "সালেম ভাই, জান্নাতে চলে গেছেন!"
এ গল্পটা আগেও পড়েছিলাম কোথাও। চোখে পানি এসেছিল। এবার যেন ভিতর থেকে কান্না আসছিল। গল্প পড়তে পড়তে কখনো জানালা দিয়ে মাথা বের করে চোখের পানি মুছেছি। চোখ কচলিয়েছি। এরপরের গল্পটা এক অভাগা সন্তানের। যার মাকে সমুদ্রের পাড়ে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে চলে আসে। যিনি লিখেছেন, তিনি সেই বৃদ্ধা মাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায়। তখন রাত একটা বাজে। বৃদ্ধা মা তার সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। লোকটি সে চিরকুটের লেখাটি পড়ে বিচলিত হয়ে পড়েন। যেখানে লেখা ছিল 'উনাকে যেন কেউ বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দেয়।' তারপর তিনি তাকে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন।
কষ্টের গল্প গুলো পড়তে পড়তে শুধু কষ্টই লাগছিল। এবারের গল্পটি একই সাথে কষ্ট এবং ভালা লাগা কাজ করছিল। এক ধার্মিক ছেল তার বাবার প্রতি সব দায়িত্ব পালন করতেন। একদিন সে নিজের বাবার পালন করা সব দায়িত্বের প্রতিদান হিসাবে অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই তিনি তার বাবার কাছে গিয়ে সব বলে। তিনি বাবার আর একটি শেষ ইচ্ছা পূরনের কথা জানায়। বাবা তাকে একটি আপেল আনতে বলেন। ছেলে খুশিতে আপেল নিয়ে এলে ছেলেকে বলেন পাহাড়ের উপর নিয়ে যেতে। ছেলেও তাকে নিয়ে যায়। ওখানে গিয়ে বাবা আপেল গুলো ছুড়ে নিচে ফেলে দেয়। সন্তানকে বলে তুলে আনতে। সন্তান ধৈর্য ধরে এককবার, দুইবার, তিনবার তুলে এনেই চরম বিরক্ত হয়ে যায়। বাবাকে এসবের কারণ জিজ্ঞাসা করলে বাবা উত্তর দেয়। এই পাহাড় থেকেই ছোটবেলা কতশত বার তুমি খেলার ছলে বল ফেলে দিয়েছিলে। আমি নিজে বাববার নিচে গিয়ে তুলে এনে দিতাম। আর আজ সেই একই কাজ তুমি কয়েকবার করেই ভাবছো তোমার দায়িত্ব শেষ! তারপর ছেলেটা বুঝতে পারেন, সত্যিই এ ঝণ শোধ হবার নয়! এ গল্পে যেমন আছে শিক্ষা তেমনি আছে বাবা মাকে ভালবাসার অনুপ্রেরণা।
এরপর একে একে আরো অনেক গুলো গল্প লেখা আছে বইটাতে। যেমন অবাধ্য সন্তানের করুণ পরিনতি। বাবার ভালবাসা বুঝতে না পারা কোমর ভাঙা যুবক। ভাগ্যিস তার জীবনটা ছিল। আবার মায়ের নিজের চোখে দুনিয়া দেখেও ছেলেটির অহংকার, নিজের মা কানা বলে দূরে চলে যাওয়া। যখন মায়ের চিঠি পড়ে ভুল বুঝতে পারে ততদিন তার মা আর দুনিয়ায় নেই। কিংবা নিজের সন্তানকে রেখে মায়ের জীবন বাঁচানো সেই মেয়েটির গল্প, পরবর্তিতে কঠিন আগুন থেকেও তার সন্তানকে ফিরে পাওয়া। অথবা রেষ্টুরেন্টে নিজের বাবাকে অত্যন্ত ভালো ভাবে খাইয়ে দেওয়া লোকটার গল্প। যার কাজ দেখে সেদিন অনেকেই ছি ছি ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকা। শেষমেশ তাদের জন্য শিক্ষা রেখে যাওয়া, নিজের বাবা মায়ের যত্ন নিতে হয়। আবার সন্তানের জন্য খালি পেটে থাকা মায়ের খেয়েছি বলে মিথ্যা বলা। আর সেই ব্যক্তিটির গল্প, ২০ হাজার দিনার দিয়ে স্ত্রী কে গহনা কিনে দিতে পারলেও ১০০ দিনারের জন্য মায়ের আঙুল থেকে আংটি খুলে নেওয়ার! অথবা মুহাদ্দিস লোকটি মায়ের শেষ সময়ে মায়ের দাবীর মূল্য না দিয়ে গভীর অনুসোচনার গল্প।
নিজের মাকে হত্যা করা ইহুদি ছেলেটির গল্প, যে শেষে কোরআন এর হাফিজ হয়ে ফাসিকাষ্ঠে ঝুলে। লোভি সন্তানের ঘটনাটা। বাবার জন্য সৌদিতে কর্মরত ছেলেটির আত্মত্যাগ। নিজের বাবার প্রতি অনাচার করা ছেলেটির গল্প, যেখানে সেই অনারচার করা লোকটির সন্তান তার বাবার কাছ থেকেই শিক্ষা নিয়ে তার বাবার সাথেও একই ব্যবহার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। শূন্যতার গল্পটি পড়ে আমার ভিতরের সেই শূন্যতাই জাগিয়ে তুলেছে, আজ আমার বাবা নেই প্রায় দুই বছর! তারপর স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন, আনুগত্যের গল্প, আর মায়ের অভিশাপ। এত কিছুর পরেও একজন বৃদ্ধের ইসলাম গ্রহনের গল্প। কারো শোচনীয় পরিনতির গল্প। ফজল বিন ইয়াহিয়ার গল্পটা সন্তানদের শিক্ষা দিয়ে যায় কিভাবে বাবা মায়ের অগ্রাধিকার দিতে হয়। কিংবা ইবনে তাইমিয়ার মাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ছোট্র চিঠি খানা। ধনী লোকটাও মায়ের সাথে অসদাচরণ করে রাস্তার ভিখিরি হয়ে যাওয়া। উত্তম স্ত্রীরর মাধ্যমে বাবা সন্তানের বিচ্ছিন্ন সম্পর্জ জোড়া লাগানোর গল্প।অবাধ্যতা বা উপলব্ধির গল্প গুলো পড়েও অনেক কিছু শেখার আছেন আবার মন্দ স্ত্রী এর অত্যাচারে মায়ের সাথে ছেলের সম্পর্কের অবনতি এবং ভুল বোঝার অবসানের গল্পটা।
এরপর একে একে গল্প গুলো পড়ে শুধু কেঁদেছি। আফসোফ করেছি। অনুসোচনায় পোড়া মানুষের মনের গন্ধ নিয়েছি। তবে যে গল্পটা পড়ে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি, সে গল্পটা হলো, মাকে পাওয়ার জন্য যে মামলা পরিচালিত হয়! এ গল্পটা পড়তে পড়তে বইয়ের উপর কখন যে চোখের পানি পড়ে যায় বুঝতেই পারিনি। বুঝা মাত্রই পানিটা মুছে ফেলেছি টিসু দিয়ে। একে তো অন্যের বই তার উপর জোর করে নেওয়া। এমন সময় সামনেই দিকে তাকাতেই দেখি সামনেই সীটে বসা লোকটা এবং মহিলাটা আমার দিকেই চেয়ে আছে অপলক। তাদের দেখে আর কোন দিকে তাকায়নি। না অন্যপাশের মুরুব্বির দিকে, না তার পাশে বসে থাকা মেয়েটার দিকে। আবারো বইয়ের সাগরে ডুব দেই। তারপর প্রথম অংশটা শেষ করতে করতে ট্রেন নিজের ঠিকানায় এসে যায়। প্রথম অংশের গল্প গুলো সত্যি অসাধারণ ছিল। যতটা শুনেছিলাম মনে হয় বইটা সম্পর্কে কমই বলেছে সবাই।
তখন রাত প্রায় ১০ টা বাজে। শহর পেরিয়ে গ্রামে যখন গিয়েছি শুনশান নিরবতা। কেউ জেগে নেই। বাসায় গিয়ে জলদি ঘুমিয়ে পড়ি। সকালেই আবার শহরে যেতে হবে ভোরের আলো ফোটার আগেই। যেই কাজে হুট করে যাওয়া।
০৮/১০/২০১৮
মুয়াজ্জিন সাহেব ঘুম থেকে উঠার আগেই বিছানা ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছাড়ি। জনমানব শূন্য রাস্তা, শহর। কাজটা শেষ হতেই আবার গ্রামে ফিরি। ততক্ষণে দুপুর পেরিয়ে গেছে। গ্রামে যেতে যেতে বিকাল হয়। ইচ্ছে হলো বিকাল বেলা নদীর পাড়ে গিয়ে বইটার বাকি অংশ পড়বো। কিন্তু গ্রামে ফিরে আসতেই মামাতো ভাই, পাড়াতো ভাইদের আশা মিটাতে গিয়ে বিকালটায় তাদের সাথে ঘুরতে গেলাম নদীর তীরে। তাদের আসল উদ্দেশ্য ওদের ছবি তুলে দেওয়া। দিলাম ছবি তুলে। নিজের ও ইচ্ছে হলো প্রোফাইলটা অনেক পুরনো। দেখি নতুন কোন প্রোফাইল দেওয়ার মত ছবি তুলতে পারি কিনা। ক্যামেরার সাথে সাথে নিজের মোবাইলের কানেকশন ঘটিয়ে অস্তমিত সূর্যের সাথে ক্যামেরাবন্দি হলাম। এখন যেটা প্রোফাইলে দেওয়া আছে।
তারপর সন্ধ্যার পরেও কেউ ছাড়লোনা। ওদের সাথেই সময় দিতে হলো। খাওয়া দাওয়া হলো। ততক্ষণে অনেক রাত। বই পড়তে ইচ্ছে করলেও ক্লান্ত দেহ সায় দিচ্ছিল না। তারপর ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে নিজের শহরে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রাইভেট কারের বন্দোবস্ত হয়েছিল। মামাতো ভাই আসবে বিমানবন্দর সৌদি ফেরত মামাতো ভাই কে নেওয়ার জন্য। আমি তাদের সাথে গাজীপুর এসে নেমে যাবো।
০৯/১০/২০১৮
প্রাইভেট কার চলছে। ডাইবার, আর মামাতো ভাই সামনের সীটে। পিছনের সীটে ভাগ্নি। ওর বাবাই আজ আসছে। আর আমি। জানালার গ্লাস খুলে খোলা বাতাসে বইটার বাকি অংসজ পড়তে শুরু করেছি। প্রচন্ড বাতাসে চোখ খোলা রাখা যায় না। তাই কালো চশমাটা চোখে দিয়ে পড়ছি।
দ্বিতীয় অংটার নাম 'কুর'আন ও হাদিস থেকে নেওয়া'। সাতটি ঘটনার উপর লেখা হয়েছে এ দ্বিতীয় অংশটি। প্রথম ঘটনাটি হলো, ইবরাহীম (আ) এর নম্রতা নিয়ে। তার বাবাকে সত্যের পথে দাওয়াত দেওয়ার পরে তার বাবার সকল ক্ষুব্ধ আচরণ তিনি নম্রভাবেই সয়ে গেছেন। এসব থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। তারপরের ঘটনাটি জুরাইনের। যে ছিলেন তার সময়কার জ্ঞানী ব্যক্তি। কোন বিষয়ে কারো জানার হলে তার কাছ থেকে জেনে নিত। একই সাথে তিনি ছিলেন আল্লাহ ভীরু। একদিন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন তিনি। এমন সময় তার মা এসে দরজায় কড়া নাড়ে। কিন্তু তিনি আল্লাহর ইবাদত এ মগ্ন ছিলেন বিদায় খুলেননি। তারপর তার মা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অভিশাপ দেয়। জীবনে যেন কোন ভ্যাবিচারি নারীর সাক্ষাত পায়। তারপর থেকেই ঘটে যায় সব ঘটনা। সেখানকার কিছু খারাপ মানুষ জুরাইন কে সহ্য করতে পারতেন না। তারা এক ব্যাভিচারি নারীর মাধ্যমে তার চরিত্রে ধংশ কর‍তে না পেরে এক রাখালের সাথে খারাপ মহিলার ব্যাভিচার করে সন্তান জন্ম দেয়। এবং সবাইকে বলে এটা জুরাইনের সন্তান। লোকেরা তার বাড়ি ঘর ভাংচুর করে। তাকে মারধর করে। শেষে তিনি বাচ্চা টাকে নিয়ে আসতে বলেন। বাচ্চাটাকে আনা হলে বাবার পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হয়। বাচ্চাটা সব বলে দেয়। তারপর জুরাইনকে সবাই আরো সম্মান করতে থাকে।
তারপর একে একে উমার (রাঃ) এর শাসনামলের কিলাব নামক এক যুবক ও তার পিতামাতার ঘটনা। যে ঘটনায় উমর (রাঃ) নিজে কান্না করেছেন। তারপর সেই তিন ব্যক্তির বিপদের গল্পটাও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে পাহাড়ের গুহায় আটকা পরে নিজেদের ভালো কাজের উছিলায় আল্লাহর সাহায্য চান। আবার বাবা মায়ের দোয়ায় আউফ (রাঃ) এর শত্রুদের হাত থেকে মুক্তি অসামান্য ঘটনাটা।
উমার ইবনু যর (রাঃ) এর সন্তানের উত্তম আচরন ও সম্মান। অমুসলিম পিতা মাতার সাথে আচরণ কিভাবে কর‍তে হবে, তা সাদ (রাঃ) এবং তার মায়ের ঘটনার মাধ্যমে সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তারপরের ঘটনা একটি হাদিছ। দীর্ঘায়ু ও সম্মদ লাভ কিভাবে করা যায় তা নিয়েই। সর্বশেষ ঘটনাটি হলো, এক ইয়েমেনির ঘটনা।
সর্বশেষ পবিত্র কোরআন এর একটি আয়াত দিয়ে বইটা শেষ হয়। "তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও 'ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।" [সূরা বানী-ইসরা'ঈল-- ১৭,১৮]
কিছুক্ষন পরেই বইটি পড়া শেষ হয়। পরে দেখি ভাগ্নি চেয়ে আছে বই টার দিকে। ওর হাতে দিলাম। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখছে। কয়েকটি গল্প বের করে বললাম এগুলো পড়ো। ও পড়লো। তারপর গাজীপুর আসলে নেমে যাই। বইটা নেওয়ার সময় চেয়েই ছিল বইয়ের দিকে। নিজের হলে দিয়েই দিতাম। কিন্তু অন্য জনের বই তাই বললাম, বইটা লাগবে। ও আমতা আমতা করে বলেছিল, আব্বারে কইমু, আব্বা আইন্না দিবো।" পরে আর কথা না বাড়িয়ে বিদায় নেই।
পাঠ্য-উপলব্ধিঃ
যেই বইটা পড়ে মানুষের চোখের পানি চলে সে বইটা সম্পর্কে উপলব্ধিটা কিভাবে ব্যক্ত করা যায় জানিনা। তবে এই বইটার যারা প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে তারা আমার মতে অনেক কমই বলেছে। হ্যাঁ, আরিফ আজাদের 'প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ' যদি ১.৫ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে থাকে তাহলে এই বইটা কমপক্ষে ১০ লক্ষ মানুষের কাছে, না আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিৎ। কেন উচিৎ তা বোঝার আমাদের সারা পৃথিবীর দিকে তাকাতে হবে না, বাংলাদেশের সমাজ জীবনে তাকালেই তা অনেকটা ধারণা করতে পারছি।
চারদিকে মানুষ রূপি পশুদেরই দেখা মেলে বেশির ভাগ। এখন আর নিউজ হয় না, ওমুক প্রফেসর তার মাকে বিদ্যাশ্রমে রেখে এসেছে। বরং নিউজ হয় অমুক ছেলে তার মায়ের জন্য এই করেছে সেই করেছে। এর একটা কারণ হলো, সমাজে একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেটা হলো, বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা যেন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এসব নিউজ আর খুব বেশি চলে না। এখন চলে ওসব নিউজ যেগুলো সহজে ঘটেই না। মানে বাবা মায়েদের জন্য সন্তানের আত্মত্যাগ!
আমার যদি সাধ্য থাকতো তাহলে আমি আমাদের বাংলাদেশের বৃদ্ধাশ্রমে থাকা সকল বাবা মায়েদের কে এই বইটি উপহার হিসাবে দিতাম। এবং একটা অনুরোধ করতাম, আপনাদেরর সন্তানররা যদি আপনাদের সাথে দেখা করতে আসে তাহলে তাদেরকে এই বইটা আমার পক্ষ থেকে দিবেন। বাস্তবতার নিয়মটাই যেন কেমন! যার ইচ্ছে আছে তার সাধ্য নেই, যার সাধ্য আছে তার ইচ্ছে নেই! হয়তো আমার সাধ্য থাকলে আমারো ইচ্ছে থাকতো না! এর চেয়ে সাধ্যহীন ইচ্ছেটাই আল্লাহ তা'আলার রহমত আমার প্রতি!
 .
 .
 .
 .
 হঠাৎ ভ্রমণ, সঙ্গী বই ০১ / Arfin Rafi Shohel