.
বই: হৃদয়ের দিনলিপি
প্রকাশনী: মাকতাবাতুল হাসান
পৃষ্ঠা: ৬০৮, মূদ্রিত মূল্য: ৭৮০ ৳
বিষয়বস্তু: আত্মশুদ্ধি/অনুপ্রেরণামূলক
.
▶লেখক পরিচিতি:
ইমাম ইবনুল-জাওযী রহ. সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। হাম্বালি মাযহাবের এই মহান ইমামের জন্ম ৫১০ হিজরি সালে বসরায়। তিনি ছোটবেলা থেকেই ইলমপিয়াসু ছিলেন। জীবিত থাকতেই তাঁর খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফিকহ, তাফসীর, উসূল, সব ময়দানে দখল ছিল। তৎকালীন সময় তাঁর ওয়ায-বক্তৃতায় এত মানুষ ভিড় জমাত যে, জায়গা সঙ্কুলান দেয়া যেত না। হৃদয়গ্রাহী ওয়ায নসিহতে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিতেন তিনি। কলমও চালিয়েছেন সমান গতিতে। মুজতাহিদ স্তরের এই ইমান প্রত্যেক যুগের হক্বপন্থি আলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব। ইতিমধ্যে বাংলায় তাঁর কিছু গ্রন্থ অনুবাদ হয়েছে; তন্মধ্যে 'মনের ওপর লাগাম', 'শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয়', 'হাসান বাসরি' এবং 'অশ্রুসাগর' উল্লেখযোগ্য।
.
▶হৃদয়ের দিনলিপির সারকথা:
হাতে নিলে বইটির কাঠামো বলে দেবে, এটা মূলত ইবনুল-জাওযীর ব্যক্তিগত ডায়েরী। এখানে তিনি সময়ের পরিক্রমায় মনের কথাগুলো এঁটে দিতেন। কখনো দুনিয়া-বিমুখতা গুরুত্ব নিয়ে, কখনো এর বাড়াবাড়ির সমালোচনা, কখনো শয়তানের চক্রান্ত, নফসের সমালোচনা, আমলের অনুপ্রেরণা, আখিরাতের ভীতি, গাফলতির ক্ষতি নানান বিষয়ে উন্মেষ ঘটিয়েছেন এই গ্রন্থে। বইটি পড়ার সময় পাঠক যেমন ইবনুল-জাওযীকে চিনতে পারবেন, তেমনি রূহানীয়াতের এক নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করবেন। ফেসবুক-বিহীন সেই যুগে একজন আলিম কীভাবে এত দুর্দান্ত, যুগান্তকারী কথাগুলো লিখে যাচ্ছেন, ভাবনার দুয়ারে এই প্রশ্ন প্রায়ই উপস্থিত হবে।
.
▶ভালো লাগার মতো বিষয়:
প্রতিটি অধ্যায় অত্যন্ত গভীর মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা সমৃদ্ধ হওয়ায় আমার চিন্তাধারার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তাই যখনই বইটি নিয়ে বসি, ভিন্ন জগতে চলে যেতে বাধ্য হই। সকল মনোযোগ যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে আসে। কুরআন, সুন্নাহ, ইবাদতের মর্মকথা, ইত্যাদি বিষয়ে গভীর অনুধাবন এবং চিন্তার গভীরতা অর্জনে বইটি বেশ ফলপ্রদ। যতটা ধীরে ধীরে পড়া হয়, তত বেশি মনিমুক্তোয় আবিষ্কার করা যায়। তাই বইটি সকলের একবার হলেও পড়া উচিত। আর কাগজের মান ১০-এ ৭ দিবো। তবে প্রচ্ছদ-শিল্পীকে ৫ এর বেশি পারছি না।
.
▶যা কিছু ভালো লাগেনি:
লেখক প্রায় পরিচ্ছেদে যুহুদের নামে বাড়াবাড়ির সমালোচনা করেছেন। এ থেকে বুঝি লেখকের সময় ভ্রান্ত সূফীবাদ বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনার মাত্রা এতটাই বেশি লেগেছে যে, এই বই পড়ার পর যদি কেউ সাহাবীদের চোখে দুনিয়া বা তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া পড়েন, তাহলে একঘেয়েমি কাজ করবে। তাই সম্পাদকের উচিত ছিল এসব ক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত টীকাটিপ্পনী যুক্ত করা, যেন সাধারণ পাঠকগণ লেখককে ভুল না বোঝেন, আবার পূর্ববর্তী নেককারদের প্রতিও সুধারণা রাখতে পারেন।
.
▶অনুবাদ এবং সাহিত্যমান:
ভাষার মান ভাল ছিল। খুব একটা বানান ভুল চোখে পড়েনি। আর সাহিত্যমান সংক্ষেপে বললে 'ভাষা আছে ভাব নেই'। প্রতি পাতায় হোঁচট খেতে হয় আমার। কেন যেন মনে হয়েছে, অনুবাদক জোরপূর্বক কাঠিন্যের পথ ধরেছেন। এমন জটিল বাক্য প্রায়ই পেয়েছি যা কম শব্দে বা আগে পিছনে ফেলে সুন্দর অনুবাদ দাঁড় করানো যায়; অর্থের বিকৃতিও হতো না, আবার বাক্যগুলোও হৃদয়গ্রাহী হতো। এজন্য কিছু বাক্য অত্যন্ত অন্তর-স্পর্শী অর্থ বহন করলেও অনুবাদের কাঠিন্যের কাছে এর তেজ লোপ পেয়েছে। অনুবাদক এবং সম্পাদকের প্রতি সম্মান রেখে বলব, বইটির অনুবাদ কর্কশ লেগেছে আমার। অধিকাংশ বাক্যগুলো শ্রুতিমধুর নয়। সম্ভবত অনুবাদে মূলানুগ-নীতি অনুসরণ করেছেন তারা। তবে একই লেখকের অন্য বইগুলো পড়লে ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই! আল্লাহ ভাল জানেন। সবার সাহিত্য-রুচি সমান নয়, সাহিত্যের সাথে সম্পর্কও সবার পাকাপোক্ত নয়। তাই অনেকের কাছেই আবার এটা চমৎকার অনুবাদকর্ম বলে বিবেচিত হবে। যদি সামগ্রিক গুরুত্বের কথা ভেবে এই বিষয়টি এড়িয়ে চলা যায়, তাহলে বইটিকে গত বছরে সেরা দশটি বইয়ের একটি বলব।