শব্দতরু ইসলামি বই গ্রুপ রিভিউ প্রতিযোগিতা জানুয়ারি ২০২০

বই- চিন্তাপরাধ
লেখক- আসিফ আদনান
প্রকাশক- ইলমহাউস পাবলিকেশন
নির্ধারিত মূল্যঃ ১৯০ টাকা

📌বই রিভিউঃ
'চিন্তাপরাধ' বইটিতে অনেকগুলো প্রবন্ধ আছে, যার মূল বিষয় হলো বিশ্বরাজনীতি ও ইসলাম। সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুগুলোকে আমরা কোন দৃষ্টিতে দেখব, আমাদের চিন্তার মাপকাঠি কেমন হবে, এসবই এই বইয়ের মূল আলোচ্য বিষয়। বইটির বেশিরভাগ লেখাই মৌলিক, এছাড়া চারটি লেখা অনুবাদ, এর মধ্যে তিনটি আবার সংযোজন, পরিবর্তন, পরিমার্জন করা। বইটা একটু কঠিন ভাষায় লেখা। এটা সবার জন্য না। কেউ যদি নিরীহ- নিষ্ক্রিয়-গৎবাঁধা চিন্তার বাইরে গিয়ে সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুগুলোকে একটু অন্যভাবে দেখতে চান, তাহলে এটাই হবে তার অপরাধ। চিন্তাপরাধ। এই বইটা যারা পড়বেন তারা প্রত্যেকেই হবেন চিন্তাপরাধী।

1⃣
"সহস্র সূর্যের চেয়ে উজ্জ্বল"- চিন্তাপরাধ বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টার এটা। চিন্তার জগতে প্রথম আঘাত। কঠিন কঠিন শব্দ দিয়ে সাজানো প্রত্যেকটা বাক্যে স্পষ্ট করে বণর্না করা হয়েছে আমেরিকা কত সালে কোথায় কোথায় গণহত্যা করেছে, কত মানুষ মারা গেছে, এবং প্রত্যেকটা সন্ত্রাসী হামলার পর আমেরিকা নির্লিপ্তভাবে দায় স্বীকার করেছে বিশ্ববাসীর সামনে। সেই ১৯৪৬ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার পর থেকে এখন ২০২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকা হত্যা করেছে প্রায় ২ কোটি মানুষ। যখন যাকে দরকার মেরেছে, দখল করেছে, ধ্বংস করেছে। এবং আমেরিকার করা প্রতিটি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটার সাথে সাথে বৈধতা পেয়েছে। অবাস্তব হলেও সত্য, এই আমেরিকাই নিজেকে উপস্থাপন করেছে সভ্যতার ত্রানকর্তা হিসেবে!

2⃣
'সাম্রাজ্যের সমাপ্তি'- এই লেখাটা "End of Empire" এর সরাসরি ভাবানুবাদ, লেখকের নিজস্ব লেখা নয়। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সামরিক সম্প্রসারণ ও গনহত্যা চালানো এই আমেরিকার পতন ঘনিয়ে আসছে। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো- ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ। আমেরিকা তার মিস্টিক হারিয়েছে। আমেরিকা এখন বিশ্বজুড়ে উপহাস ও ঘৃণার পাত্র। ঐতিহাসিক আলফ্রড ম্যকয়ের ধারণা, আমেরিকা সাম্রাজ্যের পতন আসবে ২০৩০ সালের মধ্যে। সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়বে, যার আলামত এখনই দেখা যাচ্ছে।

3⃣
"হাউস নিগার"- এই লেখাটা পশ্চিমের কাছে মুসলিমদের পরাজিত মানসিকতার প্রসঙ্গে। মডারেট ও সংস্কারপন্থী ইসলামিস্টদের মুখে আজ আমরা বারবার শুনি- আমরা পশ্চিমের কাছ থেকে ভালোটা নিবো, মন্দগুলো বাদ দিবো। অথচ, ইসলাম পরিপূর্ণ। এটা একটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, ও স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি। ইসলামের কোনটা রেখে কোনটা বর্জনের কোন সুযোগ নেই। এ শতাব্দীর মডারেট ইসলামিস্টরা পশ্চিম ও ইসলামের মৌলিক সংঘর্ষকে অস্বীকার করে। ফলে, 'ইসলাম'কে পাওয়া যাচ্ছে ইসলাম ও কুফরের অদ্ভুত এক মিশেলে। যেকারনে খিলাফাহ, শরীয়াহ শাসন, হুদুদ, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, জিহাদ থেকে শুরু করে দাড়ি-টুপি কিংবা হিজাব-নিকাবের মতো জিনিসকে পশ্চিমা তর্কের ভাষায় সমর্থন করা হচ্ছে।

চিন্তার জগতকে ঝাঁজরা করে দেয়ার মত আরও অনেকগুলো লেখা আছে এই বইতে। 'ফিরিঙ্গিসেন্ট্রিক', 'গোড়ায় গলদ', 'শুভঙ্করের ফাঁকি', 'ভুল মাপকাঠি', 'সমকামী এজেন্ডা : ব্লু প্রিন্ট', 'শ্বেত সন্ত্রাস' এই লেখাগুলো আমাকে জানিয়েছে না জানা অনেক কথা, উপস্থাপন করেছে সমসাময়িক ঘটনাগুলোকে বিচার করার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

📌বইটির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে:
১. বইটিতে শুধু সমস্যার কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু সমাধানের রাস্তা দেখানো হয়নি।
২. বইটি খুবই কঠিন ভাষায় লেখা। লেখার ভাষা মোটেও প্রাঞ্জল না। আরেকটু সহজ করে লিখলে পড়তে সুবিধা হতো।

📌ভাল লাগার মতো বিষয়:
১. বইটিতে প্রচুর রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। আগ্রহী পাঠক চাইলে মূল সোর্স থেকে দেখে নিতে পারবেন।
২. কিছু লেখার শিরোনাম অদ্ভুত সুন্দর। যেমনঃ ফিরিঙ্গিসেন্ট্রিক, হাউস নিগার।
৩. উৎসর্গপত্রটি অন্যরকম। ৩৩:২৩। কুরআনের সূরা আহযাবের ২৩ নাম্বার আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন লেখক।
"মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে করা তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে।তাদের কেউ কেউ তাদের দায়িত্ব পূর্ন করেছে, আবার কেউ কেউ প্রতীক্ষায় আছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তনই করেনি।"(সূরা আহযাব, ৩৩ঃ২৩)

📌শেষকথাঃ
পশ্চিমের তৈরী চোখ ধাঁধানো সভ্যতার দিকে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু আমরা কখনো তাকাই না সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমকামিতা, শিশুকামিতা, এমনকি পশুকামিতাসহ নানান বিকৃতিতে সভ্যতার নোংরা, দুর্গন্ধময় দগদগে গায়ের দিকে।

বইটির লেখককে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন।

#ইসলামি_বই_রিভিউ_প্রতিযোগিতা_জানুয়ারি_২০২০