"শব্দতরু বিশেষ রিভিউ প্রতিযোগিতা নভেম্বর ২০১৯"

                              -------------------------------------
                                আঁধারে আলোর মশাল
                             --------------------------------------

 বান্দা। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি 'দাসত্ব' করে যাওয়াই যার কাজ। সেই দাসত্বও তার সমশ্রেণির কারো নয়, বরং দাসের একমাত্র মালিক 'আল্লাহ তাআলা'র জন্য। তবে দাসত্বের কাজ করে কেউ সত্যিকারের দাসে পরিণত হতে পারে, কেউ পারে না৷ পারে না বলতে- করেই না। দাসত্বের স্বীকারোক্তিই দেয় না। হয় 'চলনে', আরেকটু মারত্মক হলে 'বলনে' ।

 এ-তো গেল অকৃতজ্ঞদের কথা। কৃতজ্ঞতার চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকা দাসেরাও সব এক হয় না। কারো দাসত্ব হয় কৃত্রিম, কারোটা লোভে, কারোটা নিষ্ঠার সাথে। এই শ্রেণির ভেতরেও 'কৃত্রিম দাসেরা' কেবল অন্য দাসদের চোখেই দাস হতে পারে, মালিকের চোখে নয়। 'লোভী'রা অবশ্য জান্নাতের লোভেই দাসত্বকে মেনে নেয়। তবে মহান মালিকের প্রতিশ্রুত জান্নাতের 'বিনিময়ে' তাদের অল্প সময়ের তুচ্ছ এই দাসত্বকে দাড় করিয়ে দেয়। নিজেদেরকে জান্নাতের ক্রেতা ভাবতে শুরু করে, তাও তাদের 'খাদযুক্ত' আমলকে মূল্য ধরে! বড়ই অদ্ভূদ!

 তৃতীয় দল তো মাশা-আল্লাহ দাসত্ব করে যায় 'মালিক বলেছে তাই'। কেবল তাকে খুশি করতে। কোনো যুক্তি তর্ক, কোনো লাভ লোকসানের তোয়াক্কা না করে। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব না মিলিয়ে কেবল 'এক মালিকের' ফরমান মানায়-ই নিজেদের সুখ খুঁজে পায়। তারা তো চিন্তা মুক্ত৷

 তবে দুশ্চিন্তা হলো আগেরদের নিয়ে। বিশেষত বড় আফসোস 'লোভী দাসদের' নিয়ে। তাদের সমস্যা কেবল দৃষ্টিভঙ্গির। কাজ তো যথারীতি করেই যাচ্ছে। তাই ভুলটা ভাঙিয়ে দিলেই সব সমস্যা মিটে যায়।

----------------এসব দিক চিন্তা করেই উম্মাহর দরদী দাঈ ইবনু রজর হাম্বলি রহ. এ-বিষয়ে কলম ধরেছেন। রচনা করেছেন 'আল-মুহাজ্জাতু ফি সিয়ারিদ দুলজাহ' নামক পুস্তিকা। যা শব্দতরু আহমাদ ইউসুফ শরীফ দা. বা. এর অনুবাদে 'আঁধারে আলোর মশাল' নামে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। 'লেখক' পাঠকমহলে সবার কাছেই সুপরিচিত মুখ। তাই নতুন করে সংক্ষিপ্ত কিংবা বিস্তারিত কোনো 'লেখক পরিচিতি'র উল্লেখ একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। 

                                  ★ বই কথনঃ
                             ----------------------------

' তোমাদের কারো আমল কিছুতেই তাকে মুক্তি দিতে পারবে না। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনাকেও না?' তিনি বললেন, 'আমাকেও না। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে তাঁর রহমত দ্বারা আবৃত করে রেখেছেন। অতএব তোমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করতে থাকো, নৈকট্য লাভ করো, সকাল, সন্ধ্যা ও রাতের শেষ প্রহরে আমল করতে থাকো আর মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। মধ্যপন্থা তোমাদের লক্ষ্যে পৌছে দেবে।'

 এই হাদীসটির মাধ্যমেই লেখক বইয়ের সূচনা করেছেন। হাদীসটি আমাদেরকে পরিস্কার এই বার্তা দিচ্ছে, কেবল আমল কখনোই কাউকে জান্নাতে পৌছে দিতে পারে না। বইয়ের সিংহভাগ আলোচনা এই বিষয়টা কেন্দ্র করেই।

 বইয়ের শুরুতেই ছোট্ট করে একটি ভূমিকা টেনে তাতে মূলনীতি নির্ভর কিছু হাদীস তুলে আনা হয়েছে। আর পুরো বইয়ের আলোচনা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই হাদীসগুলোতে এসেই ঠেকেছে।

 ভূমিকার পরেই লেখক একটি মূলনীতি এনেছেন। 'শুধু আমল মানুষকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতে নিতে পারবে না।' এবং এই মূলনীতির প্রমানে আয়াত, হাদীস ও সালাফদের বাণি উল্লেখ করেছেন।

 আমরা তো সাধারণত প্রশংসাবাক্য উচ্চারণে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে থাকি। এতে আল্লাহর কতটুকু প্রশংসা আদায় হয়? এব্যাপারে দালিলিক আলোচনা এসেছে।

 নিয়ামত মানে কী, আর হামদের অর্থ কী? দুইয়ের মাঝে পার্থক্য কী, কোথায়, কেমন?

 এখন যেই দিকটা বলব এটা যে কোনো মুসলমানেরই জানা থাকা অতি আবশ্যক। নেক আমল করে অনেকেই আমরা গর্ববোধ করি। যারা নেক করে না, তাদেরকে তুচ্ছ ভাবি। আর এই নেক আমলের 'বিনিময়' হিসেবে জান্নাতের দাবি মনে পুষে রাখি। কিন্তু ক'জন জানি যে, এই নেক আমল ও জান্নাত--দুটোই আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ?

 আরেকটি প্রসিদ্ধ আপত্তি ও মরযের কথা শুনুন,
আল্লাহ-ই যদি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকেন, তবে সে কেন আমলদার, আমি কেন পাপী? দিন শেষে সে কেন জান্নাতী, আমি কেন জাহান্নামী? বিষয়টা যেহেতু খুব প্রসিদ্ধ, তাই এর প্রামাণ্য আলোচনাও আনা হয়েছে সবিস্তরে।

 নিয়ামতে 'শুকরিয়া জ্ঞাপন'। আপাতদৃষ্টিতে মুখের একটি উচ্চারণ মাত্র। কিন্তু এর তাৎপর্য অনেকেরই বুঝে আসে না। তাই একে মূল্যহীন বা তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকে। বইটি তাই শুকরিয়া আদায়ের মুল্যায়ন তুলে ধরেছে।

 সারাজীবন আমলে মশগুল থাকার দরুন কারো কারো অন্তরে এমন একটা ভাব চলে আসে, 'আমি তো তেমন পাপ করি না। সারাজীবন পূণ্যের সাগরেই ভেসেছি। সুতরাং জান্নাতের টিকেট আমার জন্য রেডি। বইটি জায়গায় জায়গায় এবিষয়ে বলেছে, সতর্ক করেছে।

 আমলের বিনিময়ে যদি জান্নাত না পাই, তবে সৌভাগ্য ও মুক্তির মাপকাঠি কী? প্রশ্নটা খুব প্রাসঙ্গিক ও জটিল। এই জটিল প্রশ্নের সুন্দর জবাবটি সহজভাবে দিয়েছে বইটি।

 অনেক ধরনের আমলই তো করি আমরা। তবে স্তর বিবেচনায় সর্বোত্তম কোনটা? কোন কাজে সহজে আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করে নেয়া যায়? এসব বিষয়ে সবিস্তরে আলোচনা হয়েছে বইয়ে।

 সোনালী যুগের সোনার মানুষ সাহাবায়ে কেরাম। তাদের চলন বলনের বর্ণনা শুনলে আমরা অবাক না হয়ে পারি না। কীভাবে পৌছলেন তারা এই অনন্য উচ্চতায়? কী তার রহস্য। সেই রহস্যের খোজ বের করার চেষ্ঠা করেছেন ইবনু রজব হাম্বলি রহ.।

 'আল্লাহ সহজ, তিনি পছন্দও করেন সহজ। ইসলামি শরীয়াহ সহজ'। কথাগুলো আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। তবে কীভাবে? এর ধরণ-ই বা কী? এর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ আনা হয়েছে বইটিতে।

 ফযীলতপূর্ণ হাদীসের অনেক জায়গায়ই আমরা 'সকাল সন্ধ্যা' পেয়ে থাকি। এর অর্থ ও সময়সীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সবকিছুতে 'মধ্যপন্থা' উত্তম বলে বিবেচিত হয়। সেই মধ্যপন্থা অবলম্বন ও এর উদ্দেশ্য আলচিত হয়েছে।

 ফিতনার এই যুগে দল মতের অভাব নেই। তবে আল্লাহকে পেতে হলে আমি কোন পথে চলব, আমার কোন আমলের বিবেচনায় আমার পরিণাম লিখা হবে।

 এখন কেউ বলে বসল, এতকিছু বলেন আপনারা মোল্লারা! আচ্ছা বলুন তো, আল্লাহর নৈকট্যলাভে বান্দার লাভটা কী? বইটি আপনাকে সেই উত্তর দিবে। এরপর আপনাকে নৈকট্যলাভের উপায়ও বলে দিবে। শুনাবে ইসলাম ঈমান ও ইহসানকে আকড়ে ধরা একঝাঁক আল্লাহওয়ালাদের বাণি।

 বইটি আপনার সামনে দুনিয়ামূখী ও আখিরাতমূখী বান্দার পরিষ্কার কিছু চিত্র তুলে ধরবে। শুনাবে এক ভয়ানক সতর্কবার্তা। আপনার এত সাধনার আমলগুলো আপনার অজান্তেই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কেন হবে এমন? কী করলে হবে আর কী করলে হবে না----বিস্তর আলোচনা হয়েছে এ-ব্যাপারে।

  গুণগত মানঃ
 ________________

 শব্দতরু নতুন এক প্রকাশনী। তবে ইতিমধ্যেই উম্মাহর মরজ উপযোগী বেশ কিছু বই তারা আমাদের উপহার দিয়েছেন। তাদের যে ক'টা বই-ই পড়েছি--সেই বিবেচনায় নিরপেক্ষভাবে বলতে পারি যে, তারা ভালো করছে। অনেক ভালো করছে।
প্রচ্ছদ, বাধাই, কভার, ভেতরের পাতা ---সবই সন্তুষজনক। ভালো লাগার মতোই।

 অনুবাদকের অন্য কোনো বই আমার পড়া হয়নি। তবে এই অনুবাদটা পড়ে ভালো লেগেছে। সহজ, সাবলীল অনুবাদ। বিশেষত অনুবাদকের 'কবি সত্তা'র প্রশংসা না করে পারছি না। মন কেড়েছে।

 টীকায় উল্লেখিত রেফারেন্সের আধিক্য যে কারো নজর কাড়বে।

 সমালোচনাঃ
 ______________

তবে 'অনুবাদকের কথা' অতটা ভালো লাগেনি। লেখাটায় আরো ভাল কিছু হতে পারত।

সম্পাদক হিসেবেও কারো নাম নেই। 'টিম' সম্পাদনা করে থাকলে সেটাও উল্লেখ করা যেত। স্বয়ং অনুবাদক হয়ে থাকলে তার নামের পাশেও 'অনুবাদের' সাথে 'সম্পাদনা' যোগ করা যেত। এতে বইয়ের প্রতি পাঠকের আস্থা বাড়ে।

অনুবাদকের অন্য কোনো অনুবাদ আমার চোখে পড়েনি। হয়ত অনেক থাকতে পারে, তবে আমি দেখিনি। শুরুতে দীর্ঘ চার পৃষ্ঠা লেখক পরিচিতি দেয় হলেও অনুবাদকের পরিচয় নিয়ে কিছু লেখা নেই। তাই অল্প কথায় হলেও 'অনুবাদক পরিচিতি' দেয়া হলে ভালো হতো।

________________________________________________

বইঃ আঁধারে আলোর মশাল
মূলগ্রন্থঃ আল-মুহাজ্জাতু ফি সিয়ারিদ দুলজাহ
রচনাঃ ইবনু রজব হাম্বলি রহ.
অনুবাদঃ আহমাদ ইউসুফ শরীফ
মূল্যঃ ১২৮ টাকা
পৃষ্ঠাঃ ১০০

#ইসলামি_বই_রিভিউ_প্রতিযোগিতা_নভেম্বর_২০১৯