L অনূদিত নাম : তাওহীদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে
লেখক : সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহি:)
অনুবাদ : আলী হাসান উসামা
প্রকাশনী : শব্দতরু প্রকাশন
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৭৫
মুদ্রিত মূল্য : ৯৬ টাকা
.
বর্তমানে আলেম সমাজের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় তার তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে কেমন যেন উদাসীন। তাওহিদ কেন্দ্রিক নীতিমালা উপলক্ষ্য করেই সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রচনা করেছেন " দ্বীনে হক আওর উলামায়ে রব্বানি শিরক ও বিদআত কে খেলাফ কিউঁ " নামক একটি মহামূল্যবান বই। বিজ্ঞ অনুবাদক আলী হাসান ওসামা কতৃক বাংলায় অনুবাদের পর যার নাম হয়েছে " তাওহীদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে "।
এক্ষণে আমি বইটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করতে চেষ্টা করবো। ইনশাআল্লাহ-
.
সার-সংক্ষেপঃ-
বইটিকে বিজ্ঞ লেখক সায়্যিদ আবুল হাসান নদভী (রহ:) সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন। এবং সেই সাথে আলোচনার সুবিধার্থে প্রতিটি অধ্যায়ে যুক্ত করেছেন বিভিন্ন পরিচ্ছেদ। এক্ষনে আমি অধ্যায়গুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চেষ্টা করবো। ইনশাআল্লাহ-
.
১। আলিমগণের দায়িত্বঃ-
এ অধ্যায়ে লেখক আলিমগণের দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কেননা রাসূল (স:) যেহেতু সর্বশেষ নবী তাই তার পরে আর কোন নবী-রাসূল পৃথিবীতে আসবে না। এমতাবস্থায় মুসলিম উম্মাহকে তাওহীদের দিকে আহব্বান করতে আলেম ওলামাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা আলিমগন গণ হলেন নবীদের ওয়ারিশ স্বরুপ। এরপর তাওহিদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সমূহ আলোচনা করেছেন।
.
২। শিরকঃ-
তাওহীদ ও শিরক পরস্পর বিপরীতমূখী দুটি বিষয়। শিরক হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কোনো বিষয়ে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করা। শিরকমুক্ত বিশ্বাসের নামই তাওহীদ। শিরক হলো একটি স্বতন্ত্র দ্বীন। কাজেই যেখানে শিরকের বীজ নিহিত থাকবে সেখানে কখনোই তাওহীদ প্রতিষ্ঠা হবে না।
.
৩। কুফরঃ-
এই অধ্যায়ে কুফর সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা স্থান পেয়েছে। কুফর হলো আল্লাহ তায়ালার কোন বিধানকে মৌখিক বা প্রায়োগিক ভাবে অস্বীকার করার নাম। এ অধ্যায়ে আরো পাওয়া যাবে তাগুতের পরিচয়, কুফর একটি দ্বীন, জাহিলিয়াতের প্রতি ঘৃণা প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা। অধ্যায়ের শেষে লেখক আলিমদের কে কুফরের বিরুদ্ধে সর্বদা সরব থাকার জন্য বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
.
৩। বিদআতঃ-
বিদআত হলো ইসলামি শরীয়তে এমন কিছু বিধিবিধান যুক্ত করা যার অনুমোদন ইসলাম কখনো দেয় নি। কাজেই কোন বিদআত সৃষ্টি করা মানে নতুনভাবে শরীয়ত প্রণয়নের নামান্তর। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ইসলামী শরীয়ত কখনো পরিবর্তন হবে না। তাই বিদআতকারীদের জন্য রাসূল (স:) কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন " যে ব্যক্তি ইসলামী শরীয়তে কোন বিদআত সৃষ্টি কিরলো সে আমাদের দলভুক্ত নয়। অধ্যায়ের শেষে লেখক বিদআত সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম, ইমামগণ ও বিরুদ্ধবাদীদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
.
৪। উদাসীনতাঃ-
আমরা দুনিয়াবী কাজগুলো খুব নিখুঁতভাবে করতে চেষ্টা করলেও আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে বেশ উদাসীন। এইসব উদাসীনতা সম্পর্কে সতর্কবাণী উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন "আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বলে, ‘শ্রবণ করলাম’ অথচ তারা শ্রবণ করে না ( সূরা আনফাল :আয়াত ২৯) এছাড়াও দ্বীনের পথে ফিরতে হলে উদাসীনগণ যেসব প্রতিবন্ধকতার সমুক্ষীন হন তা আলোচনা করা হয়েছে।
.
৫। নবীগণের উত্তরসূরিদের কাজঃ-
আলেমগণ যেহেতু নবীদের উত্তরসূরি। তাই আলেমদেরকে নবী রাসূলদের অনুপস্থিতিতে তাদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। ইতিহাস পড়লে দেখা যায় রাসূল (স:) এর পর অনেক মনিষী ও আলেম দুনিয়ায় আগমন করেছেন। যেমন - হযরত হাসান বসরি (রহি:), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহি:),মুহাদ্দিস ইবনুল জাওযী (রহি:), হযরত আব্দুল কাদির জিলানি (রহি:) সহ আরো অনেকে। যাদের দুনিয়াবী আচার আচরণ ছিল সম্পূর্ণ আখিরাত কেন্দ্রিক। তারা ছিলেন শিরক, কুফর বিদআত সহ সকল বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত। এজন্য শাসকগোষ্ঠী কতৃক তাদের নানারকম ভাবে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তবুও তারা আল্লাহর দেয়া বিধান পালন করতে পিছপা হননি।

৭. দ্বীনের ধারক ও শরিয়াহর রক্ষকদের অপরিহার্য দায়িত্বঃ-
এটি বইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়। এ অধ্যায়ে লেখক দ্বীনের ধারক ও শরীয়াহ সংরক্ষকদের অপরিসার্য কিছু দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো-
---শিরক কুফর বিদ আতের বিরুদ্ধে আলেমদের সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। যাতে মুসলমানদের ইমান ও আকিদা বিনষ্ট না হয়।
---সর্বাবস্থায় আল্লাহ ইসলামের প্রচার ও প্রসার অব্যহত রাখতে হবে। যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছেনি আলিমদেরকে তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছাতে হবে।
--- আলিমদের কুরআন হাদীসের প্রচার ও প্রসারের জন্য দ্বীনি শিক্ষা কার্যক্রম অব্যহত রাখতে হবে।
--- সর্বাবস্থায় মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে একটা ধরে রাখার কোন বিকল্প নেই। তাই সকল ভেদাভেদ ভুলে সকল মুসলমানদের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হওয়া জরুরী।
.
▶ বইটি কেন পড়বেন এবং কি পাবেন?
১। আপনি যদি তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভাবে জানতে চান তাহলে বইটি আপনার জন্য।
২। আল্লাহর ইবাদত করলে তা পরিশুদ্ধ ভাবে করছি কি না তার মাপকাঠি হিসেবে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বইটি।
৩। আপনি যদি সংক্ষিপ্ত পরিসরে শিরক, কুফর, বিদআত সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে চান তাহলে বইটি অবশ্যই পড়ুন।
৪। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দুনিয়াতে আল্লাহর একত্ববাদের উপর কিভাবে অটল থাকবেন তার দিক-নির্দেশনা পাবেন বইতে।
.
▶ ব্যক্তিগত অনুভূতিঃ-
বইটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও এর ভিতরে আছে বিস্স্তৃত জ্ঞানের মনিমুক্ত। বইটির কভার, প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং, ও ভিতরের পাতা মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর।ব্যক্তিগত অনূভুতি যদি বলতে হয় তাহলে বলবো বইটি এককথায় অসাধারন। সহজ, সাবলীল, ও বোধগম্য ভাষায় রচিত।সব ধরনের জটিলতা এড়িয়ে ইসলামকে সরল সাবলীল ভাষার তিনি উপস্থাপন করেছেন। বইয়ের প্রতিটি পাতায় রয়েছে লেখকের কঠোর পরিশ্রমের ছোয়া।
বইটি পড়তে গিয়ে কখনো মনে হয়নি যে অনুবাদ পড়ছি।বরং মৌলিক লেখা মনে হয়েছে। বইতে তাওহিদ সম্পর্কে বেশকিছু মৌলিক দিক লেখক সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
বইটি পাঠ করে যেকোনো পাঠক উপকৃত হবেন এবং তাওহিদ বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ধারণা হবে ইনশাআল্লাহ। তাই ইসলামী মনোভাবাপন্ন সকলের জন্য বইটি একবার হলেও পড়ুন আর জীবনকে রাঙিয়ে তুলুন আল্লাহর একত্ববাদের আলোকে।
,
▶ সমালোচনাঃ-
বইতে সমালোচনা করার মত তেমন কিছু নেই। তবে-
১। বইতে বেশকিছু বানান বিভ্রাট ও মুদ্রন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে।
২। বইতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা থাকায় কিছু কিছু জায়গার অনুবাদ বুঝতে কষ্ট হচ্ছে।
.
▶শেষ কথাঃ-
পরিশেষে বলতে হয় বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তাওহিদ নিয়ে এত সুন্দর একটি বই লেখার আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বইয়ের লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক এবং পাঠক সহ সবাইকে কবুল করুন।
.